লকডাউনের পথে দেশ : আসছে কঠোর সিদ্ধান্ত

জটিল কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি না হলে এই মুহূর্তে সারা দেশ লকডাউনের কোনো পরিকল্পনা নেই সরকারের। করোনাভাইরাসের কারণে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণহীন নয় বলে মনে করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সরকারের হাইকমান্ড। সারা দেশ একসঙ্গে লকডাউন না করে মানুষের চলাচল সীমিত করে একে অপরের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখার মাধ্যমে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া রোধ করার পন্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই কাজ সেনাবাহিনীর সদস্যরা ভালোভাবে করতে পারবেন বলে সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন। তাই করোনাভাইরাস প্রতিরোধ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে চলমান অন্যান্য উদ্যোগের সঙ্গে আজ মঙ্গলবার থেকে সশস্ত্র বাহিনী মাঠে নামানো হচ্ছে। দুর্যোগপূর্ণ সময়ে জেলা প্রশাসন হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করবে। এই সংকট নিয়ে প্রধানমন্ত্রী আগামী ২৫ মার্চ জাতির উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ দেবেন।

ভাইরাস ছড়ানো রোধে সরকার ২৬ মার্চ থেকে আগামী ৪ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ১০ দিন জরুরি সেবা ছাড়া সব সরকারি অফিস ও বেসরকারি অফিস ছুটি ঘোষণা করেছে। তবে এই সাধারণ ছুটিতে সব ব্যাংকের শাখা খোলা থাকবে। অবশ্য লেনদেনের সময়সূচি কমানো হবে। এ বিষয়ে আজ সার্কুলার জারি করা হবে।

আগেই সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৩১ মার্চ পর্যন্ত সব বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে এই ছুটি আরো বাড়ানো হচ্ছে। ঈদুল ফিতরের পর ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সম্ভাবনা নেই। এ ব্যাপারে আজ ঘোষণা আসতে পারে।

এদিকে পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) নেতৃত্বে চিকিৎসকদের নিয়ে ৫০০ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। এ কমিটি স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে বা যাদের সঙ্গে দরকার যোগাযোগ রেখে দায়িত্ব পালন করবে। গতকাল সোমবার একাধিক মন্ত্রী ও সরকারের নীতিনির্ধারকের সঙ্গে কথা বলে এই তথ্য জানা গেছে।

নীতিনির্ধারকরা জানান, ধৈর্য ধরে ও পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে বৈশ্বিক এই সংকট মোকাবেলা করা সম্ভব বলে তাঁরা মনে করছেন। এ ক্ষেত্রে সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও নিয়ম মানতে সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থান গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সারা দেশ একসঙ্গে লকডাউন না করে মানুষের চলাচল সীমিত করে একে অপরের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখার মাধ্যমে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া রোধ করার পন্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকার সশস্ত্র বাহিনীর সহযোগিতায় সিভিল প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে এ পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে চায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মন্ত্রী গতকাল জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আগামীকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ওই ভাষণে প্রধানমন্ত্রী করোনাভাইরাস মোকাবেলায় দেশবাসীকে ধৈর্য ধরার পাশাপাশি আরো সচেতন, আরো সুশৃঙ্খল হওয়া ও সরকারের নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলার জন্য অনুরোধ করবেন। সরকারপ্রধান এই পরিস্থিতিতে সারা দেশের জনগণের কাছে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানাবেন। তিনি জানান, তবে এর আগেই আগামীকাল (আজ) থেকে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা মাঠে নামছেন।

গতকাল সচিবালয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদসচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম সারা দেশ লকডাউনের ধারণার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি জানান, মঙ্গলবার থেকে বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে সামাজিক দূরত্ব এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থার জন্য বেসরকারি প্রশাসনকে সহায়তা দিতে সেনাবাহিনী নিয়োজিত হবে। বিশেষ করে বিদেশফেরত ব্যক্তিদের কেউ নির্ধারিত কোয়ারেন্টিনের বাধ্যতামূলক সময় পালনে অবহেলা করছেন কি না তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখবে সেনাবাহিনী ।

মন্ত্রিপরিষদসচিব জানান, ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান ছুটির আওতায় থাকবে। তবে কাঁচাবাজার, খাবার, ওষুধের দোকান, হাসপাতালসহ জরুরি যেসব সেবা রয়েছে, তার জন্য এসব প্রযোজ্য হবে না। জনসাধারণকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া (খাদ্যদ্রব্য, ওষুধ ক্রয় ও চিকিৎসা গ্রহণ ইত্যাদি) কোনোভাবেই ঘরের বাইরে না আসার জন্য অনুরোধ জানান তিনি। এই ঘোষণার আগে এসব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক হয় বলে জানান মন্ত্রিপরিষদসচিব। এরপর তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১০ নির্দেশনা পড়ে শোনান।

তিনি বলেন, ছুটির সময়ে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন অফিস-আদালতের দরকারি কাজ অনলাইনে সম্পাদন করতে হবে। সরকারি অফিসগুলোর মধ্যে যারা প্রয়োজন মনে করবে তারা অফিস খোলা রাখবে। করোনাভাইরাসের কারণে নিম্ন আয়ের কোনো ব্যক্তি শহরে জীবনযাপনে অক্ষম হলে সরকার তাকে ঘরে ফেরা কর্মসূচির অধীনে নিজ গ্রাম-ঘরে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে। সরকার এ লক্ষ্যে ভাসানচরে মানুষের জন্য পর্যাপ্ত আবাসন ও জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করেছে। আগ্রহীদের এই সুযোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হচ্ছে। তিনি জানান করোনাভাইরাসজনিত কার্যক্রম বাস্তবায়নের কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয়-অন্নসংস্থানের অসুবিধা নিরসনে জেলা প্রশাসকদের খাদ্য ও আর্থিক সাহায্য দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউসসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে আইএসপিআর এক বিবৃতিতে জানায়, বিশ্বব্যাপী মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের বাংলাদেশে সংক্রমণ, বিস্তৃতির সম্ভাব্যতা ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বেসামরিক প্রশাসনের অনুরোধে বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলো ও উপকূলীয় এলাকায় ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী নিয়োজিত থাকবে। নৌবাহিনী উপকূলীয় এলাকায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় কাজ করবে। বিমানবাহিনী হাসপাতালের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী ও জরুরি পরিবহনকাজে নিয়োজিত থাকবে।

করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে আগেই দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। নিষিদ্ধ করা হয়েছে সভা-সমাবেশ ও গণজমায়েত। এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। এরই মধ্যে লকডাউন করা হয়েছে দেশের কয়েকটি এলাকা। চারটি দেশ ও অঞ্চল ছাড়া সব দেশ থেকেই যাত্রী আসা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে দেশের সব বিপণিবিতান। এ ছাড়া মুলতবি করা হয়েছে জামিন ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি ছাড়া নিম্ন আদালতের বিচারিক কাজ। ধর্মীয় সমাবেশের ওপর কড়াকড়ি আরো করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বদ্ধপরিকর। তিনি বৈশ্বিক এই সংকট মোকাবেলার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছেন। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম সারা দেশ লকডাউন না করে আজ থেকে সারা দেশে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্তকে ভালো উদ্যোগ হিসেবে মনে করছেন। তিনি আরো বলেন, এর ফলে দেশে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবেলা সম্ভব হবে।

সূত্র- কালেরকণ্ঠ

ad
ad

জাতীয় সর্বশেষ

ad
ad

জাতীয় সর্বাধিক পঠিত

আগের সংবাদ
পরের সংবাদ