স্বর্ণের প্রকৃত মূল্য

তার আরো অনেক ইনকা পূর্বপুরুষদের মতো জুয়ান এপাজাও স্বর্ণের মোহাবিষ্ট ছিল। পেরুর আন্দিজ পর্বতমালায় ১৭ হাজার ফুট উচ্চতায় বরফাচ্ছাদিত অধোগামী সুড়ঙ্গে ৪৪ বছর বয়সী এক খনি শ্রমিক নিজেকে ক্ষুধা ও অবসাদমুক্ত রাখতে মুখে এক আঁটি কোকা পাতা মুখে দিয়ে কাজে নেমে পড়ে। বনিক বার্তা

সে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই মাসের ৩০ দিন কঠোর পরিশ্রম করে। খনন করে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শহর লা রিংকোনাদার হিমবাহের তলে থাকা খনির গভীরে। খনি থেকে পৃথিবীতে চাহিদাসম্পন্ন স্বর্ণ বের করে আনতে এপাজা নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়। তার সহকর্মীর কেউ কেউ বিস্ফোরক বা বিষাক্ত গ্যাসে বা সুড়ঙ্গ ধসে মারা যায়। এপাজা এসব প্রতিকূলতা কাটিয়ে ওঠে। ৩০ দিন বিনা বেতনে খনিতে কাজ করার পর ৩১তম দিনে ঘটত এক প্রাচীন লাটারি খেলা।

এপাজা ও তার সহকর্মীদের ৪ ঘণ্টার কিছু কম সময়ের বিরতি দেয়া হতো এবং এ সময় তাদের সুযোগ দেয়া হতো খনি থেকে নিজের ইচ্ছামতো প্রস্তর খণ্ড বয়ে নিয়ে যাওয়ার। নিজের কাঁধে করে খুব বেশি পাথর কেউই নিতে পারত না। এই প্রাচীন ভাগ গণনা পদ্ধতির নাম কাচোরিও। খনি শ্রমিক সেই পাথর ভেঙে যতটুকু স্বর্ণ পেত সেটাই তার সারা মাসের কাজের মজুরি। কখনো শ্রমিকরা কিছুটা স্বর্ণ পেত আবার কখনো একেবারেই না।

এপাজা তখনো ভাগ্য পরিবর্তনের অপেক্ষা করত। এক ঝলক হাসি হেসে বলত, ‘আজই সবচেয়ে বড় টুকরো পেয়ে যাব।’ সে হাসিতে দাঁতগুলো স্বর্ণের মতো ঝিলিক মেরে উঠত। সহকর্মীরা এ বেখাপ্পা পরিস্থিতি এড়িয়ে যেত। তারা এক বোতল পিস্কো (মদ) ও দেশী পানীয় খনির পাশেই রাখত। পাথরের ওপর বেড়ে ওঠা কোকো গাছের পাতাও থাকত। কয়েক মাস পর পবিত্র পাহাড়ের চূড়োয় একজন ওঝা দিয়ে গৃহপালিত মুরগি উৎসর্গ করা হতো।

এখন সে সুড়ঙ্গের দিকে মুখ করে নিজস্ব কুয়েচুয়া ভাষায় বিড়বিড় করে দেবতার কাছে প্রার্থনা করত স্বর্ণের জন্য, যে দেবতা এ পাহাড় ও পাহাড়ের ভেতরের স্বর্ণের খনি নিয়ন্ত্রণ করেন।‘সে আমাদের ঘুমন্ত পরী’—এপাজা বলল। সর্পিল রেখায় বরফের মাঠের খনির দিকে মাথা নাড়িয়ে বলল, ‘তার আশীর্বাদ ছাড়া আমরা সোনার ছিটেফোঁটাও পেতাম না। এমনকি স্বর্ণ নিয়ে থেকে জীবন্ত বের হতে পারতাম না।’ ৫০০ বছরের বেশি সময় ধরে হিমবাহের নিচে থাকা খনিটি পেরুর লোকজনকে আকর্ষণ করত। এর মধ্যে ইনকারাই সূর্যের ঘামের মতো চিরস্থায়ী ধাতু দেখতে পেয়েছিল। তারপর স্প্যানিশরা। তারা স্বর্ণ ও রুপার জন্য মুখিয়ে থাকত।

এ স্বর্ণ তাদের বিশ্বজয়ের আনন্দ দিত। স্বর্ণের ঊর্ধ্বমুখী দামের কারণে লা রিংকোনাদার শহর ৩০ হাজার লোক জমায়েত করে। এ শহরটা একসময় ছিল দারিদ্র্যপীড়িত কুঁড়েঘরের মতো। যা পরে শীর্ষে উঠে যায়। এই জনমানবহীন বসতি একসময় স্বপ্নবাজ আর কুশলীদের আঁতুড়ঘর হয়ে ওঠে। যদিও এতে তার আশপাশের পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছিল।

এসব দৃশ্য মধ্যযুগের বলে মনে হতে পারে। কিন্তু লা রিংকোনাদা শহরটির এসব ঘটনা আধুনিককালের, একবিংশ শতাব্দীর গোল্ডরাশের। রাসায়নিক ধাতু অঁ (স্বর্ণ) উজ্জ্বলতা ছিল এমনই কুহেলিকায় ঢাকা, যা মানুষের কল্পনাশক্তিকেও পরাস্ত করেছিল। হাজার বছর ধরে প্রভূত স্বর্ণের মালিকানা পাওয়ার লোভ মানুষকে উগ্র করে তুলেছিল, স্বর্ণের জন্য মানুষ যুদ্ধ করেছে, পর্বত কেটে মিশিয়ে দিয়েছে। মুদ্রা ও সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখা এবং যুদ্ধে জ্বালানি ও বিজয়ের মূলে ছিল এ স্বর্ণ। মানবজাতির টিকে থাকার জন্য স্বর্ণের আবশ্যকতা নেই; বাস্তবিক অর্থে মানুষের জীবনে এর কার্যকরী ব্যবহার সামান্যই। অনিঃশেষ দ্যুতি ছড়ানো ও নমনীয়তা বা দুর্লভ বস্তু হওয়ার কারণে কিংবা সম্পদ ও সৌন্দর্যের প্রতীক হওয়ায় এটি পৃথিবীর সবচেয়ে ঈপ্সিত বস্তুতে পরিণত হয়েছে।

আধুনিককালে স্বর্ণের প্রতি মানুষের তীব্র আকর্ষণ প্রাচীন বা মধ্যযুগের মতো থাকার কথা নয়। যদিও এখনো কোনো কোনো সংস্কৃতিতে এমন বিশ্বাস রয়ে গেছে যে স্বর্ণ মানুষকে অমরত্ব দান করতে পারে। বিশ্বের সব দেশ গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড থেকে বেরিয়ে গেছে, বিশেষ করে সবার শেষে যুক্তরাষ্ট্র, ১৯৭১ সালে। জন মেনারড কেইনস উপহাস করে স্বর্ণকে ‘নৃশংস অবশেষ’ আখ্যা দিয়েছিলেন। আধুনিক যুগে স্বর্ণের প্রতি আকর্ষণ কমেনি বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতায় আরো বেড়েছে। ১০ সেপ্টেম্বর ২০০১ স্বর্ণের দাম ছিল আউন্সপ্রতি ২৭১ মার্কিন ডলার; আর ২০০৮ সালের মার্চে স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি পেয়ে হয় আউন্সপ্রতি ১ হাজার ২৩ ডলার। নাইন ইলেভেনের সন্ত্রাসবাদী হামলা এবং বৈশ্বিক মন্দার মেঘ ঘনীভূত হতে থাকার সময়েও স্বর্ণের দামে আরেক ধাপ ঢেউ লাগে। ২০০৭ সালে স্বর্ণের চাহিদা খনির উত্তোলনের ক্ষমতার চেয়ে ৫৯ শতাংশ খনন বেড়ে যায়। দ্য পাওয়ার অব গোল্ড-এর লেখক পিটার এল বার্নস্টেন যথার্থই বলেছেন, ‘সবসময়ই স্বর্ণের জাদু বিরাজমান থাকে। আমরা জানি না আমরা স্বর্ণের প্রতি পাগল না স্বর্ণ আমাদের প্রতি।’

২০০৭ সালে বড় বড় বিনিয়োগকারী যখন স্বর্ণ খাতে বিনিয়োগ করতে যাচ্ছিলেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের একজন পরিবেশবাদী ‘নো ডার্টি গোল্ড’ নামে আন্দোলন শুরু করেন। সে বছর দুনিয়ায় স্বর্ণের অলংকার বিক্রি ৫৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ছিল। তিনি বড় জুয়েলারি ব্যবসায়ী ও খুচরা ব্যবসায়ীর প্রতি স্বর্ণ বেচা-কেনা বন্ধের আহ্বান জানান। কারণ খনি থেকে উত্তোলিত অপরিশোধিত স্বর্ণ পরিবেশের হুমকি ছিল। কিন্তু তার এ প্রচারণা স্বর্ণ ব্যবহারকারী দেশগুলোর কাছে ধোপে টেকেনি। যেমন ভারতের সংস্কৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে স্বর্ণ অস্তিত্বমান। স্বর্ণালঙ্কার ক্রয়ের বিবেচনায় ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে হটিয়ে চীনারা দ্বিতীয় স্থানটি দখল করে নেয়। এক্ষেত্রে সবার শীর্ষে থাকা দেশটি হলো ভারত।

ইতিহাসের শুরু থেকে মাত্র ১ লাখ ৮৭ হাজার টন স্বর্ণ উত্তোলন করা গেছে, যা অলিম্পিকের দুটি সুইমিং পুলের সমান। এর প্রায় অর্ধেক গত ৫০ বছরে উত্তোলিত হয়েছে। এখন বিশ্বের সেরা মজুদদারদের খনি দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। উপরন্তু নতুনভাবে খনি আবিষ্কারের নজির নেই। সোনালি সময়ের শেষ দিকে গরিব দেশের অভিবাসী শ্রমিকরা আগের চেয়ে কম মাত্রায় স্বর্ণ উত্তোলন করতে পারছে। জাতিসংঘের ন্যাশনাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইউনিডু) তথ্যমতে মঙ্গোলিয়া থেকে ব্রাজিল অর্থাৎ সমগ্র বিশ্বে প্রায় ১০ থেকে ২০ মিলিয়ন কারিগর স্বর্ণ উত্তোলনের কাজে নিয়োজিত রয়েছে। আগের মতোই অপরিশোধিত উপায়ে স্বর্ণ উৎপাদন চলছে, যা প্রায় বিশ্বের ১০ কোটি গ্রাহকের স্বর্ণের চাহিদা পূরণ করছে। এটি একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ।

গত দশকে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর স্থানীয় সেনাবাহিনী অস্ত্র ও তাদের ব্যয়ভারের খরচ চালাতে স্বর্ণের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে। এমনকি তারা খননকাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের নির্যাতন ও রুটিনমাফিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব কালিমান্টান প্রদেশে মিলিটারি ও সিকিউরিটি ফোর্স যৌথভাবে খনি শ্রমিকদের বাড়ি জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে দেয়। তাদের গ্রাম পুড়িয়ে দেয়। যাতে সেখানে বড় মাপের খনির সন্ধান পেতে পারে। শিলা থেকে স্বর্ণ পৃথক করতে মার্কারি ব্যবহার করা হয়। মার্কারির ক্ষতিকর প্রভাব ব্যাপক। মার্কারি থেকে তরল ও গ্যাসজাতীয় বিষাক্ত পদার্থ ছড়ায়। ইউনিডুর হিসাব মতে, তিন ভাগের দুই ভাগ মার্কারি পরিবেশে ছড়ায় খননকার্যে ব্যবহারের দ্বারা, যা পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ।

ad
ad

ফিচার সর্বশেষ

ad
ad

ফিচার সর্বাধিক পঠিত

আগের সংবাদ