দুর্নীতিবাজদের ‘লাগাম’ টেনে ধরা যাচ্ছে না কেন?

দীপক চৌধুরী : কেন দুর্নীতিবাজদের ‘লাগাম’ টেনে ধরা যাচ্ছে না- এ প্রশ্ন এখন প্রায়ই শোনা যায়। একথা নিয়ে দুই পক্ষ যার যার অবস্থান থেকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেন। একপক্ষ বলেন, দেশ জলাঞ্জলে গেল, অপর পক্ষ বলেন, ছাড় তো দেওয়া হচ্ছে না, দুর্নীতিবাজদের বিচার তো হচ্ছেই। অর্থাৎ দুরকম ব্যাখ্যা। কাজ হয়নি কিন্তু সরকারি অর্থ খরচ হয়ে গেছে কিংবা কাজ তেমন হয়নি অথচ অর্থ খরচ হয়ে গেছে- এমন প্রকল্পেরও আমরা দেখা পাচ্ছি। এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয়ের নাম করোনাভাইরাস। সাতটি থার্মাল স্ক্যানার যন্ত্র কিনেছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এখন জানা গেল, এর ছয়টিই নষ্ট হয়ে বসে আছে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে এটি আলোচনায় এসেছে তা নাহলে এর খোঁজ-খবর পাওয়া যেত না। যেন, এক শ্রেণির কর্মকর্তা বা সরকারি লোক দুর্নীতিতে এতোটাই নিমজ্জিত যে, গর্ত থেকে হাতি দিয়ে টেনে তুললেও তাদের ‘সাফ’ করা যাচ্ছে না।

এটা স্বীকার করতেই হয় যে, ইস্পাত কঠিন মনোবলে পর্বতসম বাধা ডিঙ্গিয়ে ক্রমেই এগিয়ে চলেছেন শেখ হাসিনা। কিন্তু এই সরকারের অগ্রগতি ও উন্নয়নকে দুর্নীতিবাজরা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থে বাধাগ্রস্ত করতে চাইছে। এমন সব খবর এখন সামনে চলে আসছে যা মানুষকে বিস্মিত করছে। এটি এখন ভয়ের বিষয়। দুই ভাইয়ের টাকার গুদাম, এক যুবমহিলা লীগ নেত্রীর প্রতিদিন তিন লাখ টাকা হোটেল মনোরঞ্জনের বিল। নতুন নতুন খবর বেরুচ্ছে। পাপিয়ার সঙ্গে সাংসদ, দলের প্রভাব সৃষ্টিকারী নেতার দহরম মহরমের খবর তো সরকারি দলের জন্য পীড়াদায়ক। ব্যাংক কর্মকর্তার মাধ্যমে হাজার কোটি টাকা লোপাট। দুর্নীতির জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক এনামুল বাছিরের জেল। পুলিশের ডিআইজি মিজানুর রহমান কারাবন্দি। ডিআইজি প্রিজন বজলুর রশীদ সীমাহীন ঘুষবাণিজ্যে নিমগ্ন থাকায় এখন কারাগারে। তারা বিচারের মুখে। ঘুষ খাওয়া ও ঘুষ দেওয়ায় এতো দক্ষ ছিলেন যে, ইতিহাসে ‘ঘুষবিদ হিসেবে’ তাদের নাম লেখা থাকবে। দুদকের পরিচালক কীভাবে ঘুষের বিনিময়ে ডিআইজিকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেন তা শুনে অনেককেই এখন বিস্মিত করে না। শিক্ষার ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপুমনি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অথচ এখানেও কর্মরত কয়েকজনকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ এক প্রকল্প পরিচালক আমিরুল ইসলাম। তার সীমাহীন দুর্নীতি ও অপকর্মের সংবাদ একটি বেসরকারী টিভি চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছে। সমস্যায় পড়লেই নাকি তিনি কথায় কথায় সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের নাম ভাঙ্গিয়ে চলছেন। তার প্রকল্পেই তিন টিন ও কিছু জায়গার দাম নাকি দুকোটি টাকা ধরা হয়েছে। এছাড়াও ঢাকা ও আশপাশের স্কুল নির্মাণের নামে সেখানে চলছে অনিয়ম ও দুর্নীতি। যদিও এর তদন্ত চলছে। ইতিপূর্বে এসব দুর্র্নীতি ও অনিয়মের খবর প্রচার হয়েছে জাতীয় পত্রিকাতেও। বিষয়গুলো দুদকের দৃষ্টিগোচর হলেও রহস্যজনক কারণে এসব অনিয়মের তদন্ত থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। শোনা যাচ্ছে, এ খবরটি সংস্থার নীচের দিকের একশ্রেণির কর্মকর্তা চাপা দিয়ে রেখেছেন। এ কারণেই সঠিক তদন্তের প্রয়োজনে দুদকের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বা কমিশনার ড. মোজাম্মেল হক খানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চান ভুক্তভোগীরা। বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেই মনে করেন, দুদকের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ানোর জন্য ঘনঘন চিরুণি অভিযান হওয়া দরকার।

এবার অপরদিকে আসা যাক। সমালোচকরাও স্বীকার করেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের কারণে দুর্নীবাজদের এখন গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, জেল খাটছে, বিচার চলছে। এই রীতি-পদ্ধতি দীর্ঘদিন এদেশে ছিল না। এখন অন্যায়কারী ধরা পড়লে তিনি যতো উচ্চতম ব্যক্তি বা সমাজের যে স্ট্যাটাসেরই হোন না কেন, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।

আমরা জানি, রাজনীতির কঠিন ময়দানে জাতির জনকের এই কন্যা বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি সময়ের প্রধানমন্ত্রী। তাঁর কারণেই আজ টেকসই উন্নয়নের মহাসড়কে দেশ। মোট চারবারের প্রধানমন্ত্রী তিনি। টানা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বারো বছর ধরে দুঃসাহসী নেতৃত্ব দিয়ে দেশের জনগণকে যেমন আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছেন ঠিক তেমনি স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে এক বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করতে সমর্থ হয়েছেন। ইতিমধ্যেই ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি এবং তা বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। বহুল আলোচিত পদ্মাসেতু নির্মাণ, বিনামূল্যে বই বিতরণ, সমুদ্র সীমা বিজয়, সারাদেশে মডেল মসজিদ নির্মাণ, রাজধানীসহ সারাদেশে ফ্লাইওভার নির্মাণ, ছিটমহল সমাধান, মাতৃত্বকালীন ভাতা, কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা, প্রতিবন্ধী ভাতা, বিশ্ব অটিজম আন্দোলনসহ শতাধিক বিষয়ে নেতৃত্বে বাংলাদেশ। এসব ইস্যু একসময় ছিল অচিন্তনীয়।

ক্ষমতাসীন থাকার মেয়াদে যদি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সত্যি সত্যিই সর্বশক্তি প্রয়োগ করেন, তাহলে ইতিহাসে তিনি নিঃসন্দেহে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ক্ষমতাসীন সরকারের অনেক সুখ্যাতি ও সুকৃতি জনগণের কাছে সমাদৃত হবে যদি সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে সত্যিকারের কঠোর অভিযান চালায়।

গত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে জনগণের কাছে মনে হয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার, ‘দুর্নীতির প্রতি জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে।’ এবারই কোনো রাজনৈতিক দল এত সুনির্দিষ্ট ও কঠিনভাবে নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতি দমনের প্রতিজ্ঞা করল। তিনি তাঁর প্রতিটি কাজে ও বক্তৃতায় এই অঙ্গীকারকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছেন। সময়ের প্রয়োজনে শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হতেই হবে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ad
ad

মতামত সর্বশেষ

ad
ad

মতামত সর্বাধিক পঠিত

আগের সংবাদ
পরের সংবাদ