Home / slider / হাত দিলেই টাকার খনি

হাত দিলেই টাকার খনি

Loading...

তিন বছরে দুই ভাইয়ের ৩০ বাড়ি, হকার থেকে সিনেমা প্রযোজক, ২৫ যুবলীগ নেতা লাপাত্তা, ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে ক্যাসিনোর সন্ধানে গোয়েন্দারা

হাত দিলেই মিলছে টাকার খনি। অফিসে, ফ্ল্যাটে, ক্লাবে- সবখানেই ব্রিফকেস, আলমারি, বস্তা আর সিন্দুকে ঠাসা টাকা। রাখার জায়গা ফুরিয়ে যাওয়ায় টাকাকে সোনায় রূপান্তর করে রাখা হচ্ছে। আর এসব ‘টাকার খনি’র মালিক আর কেউ নন, শাসক দলের নেতারা। অবৈধ জুয়া ক্যাসিনোর টাকায় এরা হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন অল্প সময়ে। এদের কেউ ছিলেন হকার। লাগেজ বিক্রি করতেন বায়তুল মোকাররম মার্কেটের ফুটপাথে। ক্যাসিনোর কারবার করে সেই হকার এখন চলচ্চিত্রে অর্থ লগ্নি করেন। পুরান ঢাকার দুই ভাই মাত্র তিন বছরের মধ্যেই ৩০টি বাড়ির মালিক হয়েছেন। তবে গোয়েন্দাদের ধারণা, ৩০টির সন্ধান পাওয়া গেলেও রাজধানীর বুকেই তাদের বাড়ির সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এরা এতটাই প্রভাবশালী যে, পরিবারের ১৭ সদস্য রয়েছেন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কমিটিতে। ক্লাবপাড়ার ক্যাসিনো থেকে চাঁদাবাজি করেই একাধিক আলিশান ফ্ল্যাট ও ১৪টি গাড়ির মালিক হয়েছেন ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা। স্বেচ্ছাসেবক লীগের ঢাকা মহানগরী উত্তরের সভাপতি প্রার্থী এই নেতা চলেন ২ কোটি টাকা মূল্যের হ্যারিয়ার গাড়িতে। গ্রামের বাড়িতেই ৫ কোটি টাকা ব্যয় করে ডুপ্লেক্স বাড়ি করেছেন। এসএসসি পাস কাজী আনিসুর রহমান যুবলীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের পিয়ন ছিলেন। পিয়ন থেকে দফতর সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নেওয়ার পাশপাশি এখন তিনি প্রায় হাজার কোটি টাকার মালিক। এদের বাড়িতে এখন মানি কাউন্টিং অ্যান্ড নোট ডিটেক্টিং মেশিন রয়েছে। টাকা গোনার সময় ও পরিশ্রম বাঁচাতেই এসব মেশিন তারা কিনে রেখেছেন।

শুধু এ কজনই নন, যুবলীগের অন্তত ২৫ নেতা রয়েছেন, যাদের রয়েছে ‘টাকার খনি’। ক্যাসিনো নামের আলাদিনের চেরাগের ছোঁয়ায় এরা দ্রুততর সময়ের মধ্যে টাকার পাহাড় গড়ে তুলেছেন। রয়েছে বৈধ-অবৈধ অস্ত্রের ভা-ার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেসব টাকার খনি ও অস্ত্রের ভা-ারের সন্ধানে এখন মাঠে। তবে ক্লাবপাড়ায় ক্যাসিনোতে অভিযান শুরুর পর থেকেই এই ২৫ নেতা লাপাত্তা। এদের কয়েকজন ইতিমধ্যে দেশত্যাগ করেছেন বলে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু ক্লাবেই নয়, বিভিন্ন ফ্ল্যাট এবং সুউচ্চ ভবনের ছাদ দখল করেও ক্যাসিনোর ব্যবসা পেতে বসেছিলেন এরা। সেসব ক্যাসিনোর সন্ধানে গোয়েন্দারা অভিযান চালাচ্ছেন।

গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, অবৈধ টাকা রাখার জায়গা খুঁজে পাচ্ছেন না দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও আওয়ামী লীগের নেতারা। হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করছিলেন টাকা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান শুরু হওয়ায় এই দুর্নীতিবাজ নেতারা এখন বিপাকে পড়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে তা তাদের ধারণাতেই ছিল না। গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, অনেকে বস্তায় ভরে টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছেন গ্রামের বাড়িতে, আত্মীয়স্বজনের কাছে। আবার টাকা রেখে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের অসংখ্য নেতা-কর্মী। এ ছাড়া এই মুহূর্তে গা ঢাকা দিয়ে রয়েছেন ছয় শতাধিক নেতা-কর্মী। আবার অনেকে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

দুই ভাইয়ের ৩০ বাড়ি : ক্যাসিনোর টাকায় হঠাৎ দুই ভাই মাত্র তিন বছরে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ। পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া ও নারিন্দায় ৩০টির বেশি বাড়ির মালিক হয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা দুই ভাই এনামুল ও রুপন। পুলিশ জানায়, ক্যাসিনো ব্যবসা করে হঠাৎ করে আলাদিনের চেরাগ পেয়ে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার মতো অবস্থা তাদের। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে গেন্ডারিয়া ও নারিন্দায় ৩০টির মতো বাড়ির মালিক হয়েছেন এনামুল ও রুপন। কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আকর্ষণীয় ডিজাইনের একেকটি বাড়ি যেন একেকটি প্রাসাদ। রয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরাসহ অত্যাধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থা। ভিতরের আসবাবপত্রেও অভিজাত্য আর আধুনিকতার ছোঁয়া। স্থানীয়রা জানান, কয়েক বছর ধরে ক্যাসিনো ও জুয়ার ব্যবসার টাকা দিয়ে এসব বিলাসবহুল বাড়ি এবং অবৈধ অস্ত্র মজুদ করেন এনামুল। স্থানীয়দের একজন বলেন, ‘নারিন্দায় ১০-১৫টি বাড়ি ওনারা কিনেছেন। এ সবকিছু হয় জুয়ার টাকায়। তাদের বাপ আগে থেকে এ ব্যবসা করে গেছেন। এখন তারা করেন।’ পুলিশ তাদের অবৈধ সম্পদের খোঁজ করছে।

ক্যাসিনো কারবারের মাধ্যমে কামানো টাকা ঢাকাই চলচ্চিত্রেও লগ্নি করেছেন যুবলীগ নেতারা। ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ যুবলীগের সহসভাপতি এনামুল হক আরমান একসময় ছিলেন গুলিস্তানের হকার। ক্যাসিনো কারবারের বদৌলতে তিনি বনে গেছেন চলচ্চিত্র প্রযোজক। ঢাকা মহানগরী যুবলীগের প্রভাবশালী এক নেতার বন্ধু পরিচয়ে গত এক দশকে কয়েক শ কোটি টাকা কামিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি দুটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে আরমান লগ্নি করেছেন কয়েক কোটি টাকা।

জানা গেছে, আরমানের উত্থান অনেকটা ফিল্মি কায়দায়। ফেনীর ছাগলনাইয়া থেকে ঢাকায় এসে বায়তুল মোকাররম মার্কেটের আশপাশে লাগেজ বিক্রি করতেন তিনি। এভাবে তার সঙ্গে পরিচয় হয় বিএনপির এক নেতার। সেই ঘনিষ্ঠতার সূত্রে বিএনপি শাসনামলে ‘হাওয়া ভবনে’ যাতায়াত শুরু করেন আরমান। সেই সময় ক্ষমতায় থাকা বিএনপির ছত্রচ্ছায়ায় মতিঝিল ক্লাবপাড়ায় প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন তিনি। সেই প্রভাব খাটিয়ে বিএনপি আমলেই ফকিরাপুলের কয়েকটি ক্লাবের ক্যাসিনোর নিয়ন্ত্রণ নেন আরমান। এরপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর যুবলীগে ভেড়েন। যুবলীগের এক শীর্ষস্থানীয় নেতার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ক্যাসিনো কারবারের টাকা তুলেই গুলিস্তানের হকার থেকে কয়েক বছরের মধ্যে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যান আরমান। ক্লাবপাড়ার লোকেরা জানান, নতুন মডেলের হ্যারিয়ার গাড়ি দাপিয়ে চাঁদা তুলতেন আরমান। দুটি ক্যাসিনোতে মালিকানাও রয়েছে তার। ‘দেশ বাংলা মাল্টিমিডিয়া’ নামের চলচ্চিত্র প্রোডাকশন হাউসের প্রধান কর্ণধার আরমান।

মতিঝিল ক্লাবপাড়ায় ক্যাসিনো থেকে দৈনিক চাঁদাবাজি করে একাধিক ফ্ল্যাট ও ১৪টি গাড়ির মালিক হয়েছেন এস এম রবিউল ইসলাম সোহেল (৪৫)। ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রয়েছে কোটি কোটি টাকা। নিজের গ্রামের বাড়িতে ৫ কোটি টাকায় নির্মাণ করেছেন আলিশান ডুপ্লেক্স বাড়ি। ২ কোটি টাকার দুটি হ্যারিয়ার গাড়িসহ ১৪টি গাড়ির মালিক তিনি। এর মধ্যে ১০টি গাড়ি দিয়েছেন পরিবহন সার্ভিসে ব্যবসার জন্য। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিজ নামে তিনটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন সোহেল। প্রতিটি ফ্ল্যাটের মূল্য ৩ কোটি টাকা।

এ ছাড়া ক্যাসিনোর চাঁদাবাজির টাকায় তিনি একটি হাউজিং কোম্পানি খুলে সেখানে বিনিয়োগ করেছেন প্রায় ১০ কোটি টাকা। একে একে বিয়ে করেছেন চারটি। প্রথম বিয়ে টিকেছে পাঁচ-ছয় বছর। পরের তিনটি বিয়ে গড়ে তিন-চার মাস করে টিকেছে। সব মিলিয়ে এখন শত কোটি টাকার মালিক এই এস এম রবিউল ইসলাম সোহেল।

তিনি ২০১০ সালে ঢাকা মহানগরী ছাত্রলীগের (উত্তর) সভাপতি ছিলেন। স্বেচ্ছাসেবক লীগ ঢাকা মহানগরী কমিটির আগামী সম্মেলনে সভাপতি প্রার্থী তিনি। বুধবার মতিঝিল ক্লাবপাড়ায় ক্যাসিনোতে অভিযান চালায় র‌্যাব। এর পরদিন বৃহস্পতিবার রাতে সোহেল সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে সিঙ্গাপুর পালিয়ে যান। সিঙ্গাপুরে ম্যারিনা বে স্যান্ডস হোটেলের তিনি প্রিমিয়াম গ্রাহক। সেখানেই তিনি অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।

(Visited 1 times, 1 visits today)
Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

2 × two =