Home / সর্বশেষ / জাবি ছাত্রের গবেষণা জালিয়াতিতে ফাঁসলেন শিক্ষক

জাবি ছাত্রের গবেষণা জালিয়াতিতে ফাঁসলেন শিক্ষক

Loading...

গবেষণাপত্রে ছাত্রের অভিনব জালিয়াতিতে ফেঁসে গেছেন শিক্ষক। ছাত্রত্ব শেষ হয়ে যাওয়ায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট জালিয়াতিতে অভিযুক্ত তিন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেনি। তবে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে জানিয়ে শাস্তি হয়েছে ওই শিক্ষকের।

শনিবার অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট গবেষণায় জালিয়াতির অভিযোগে পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়াকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

অপরদিকে অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরির অভিযোগে লোকপ্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ আশরাফুল হককে অব্যাহতি দেয় সিন্ডিকেট।

এ বিষয়ে এখনো প্রজ্ঞাপন জারি না হলেও শুক্রবার উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম  এসব সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেন।

অধ্যাপক আমির হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ জলাশয়ে সমুদ্রের নোনা পানি প্রবেশের প্রভাব নিয়ে ২০১২ সালে একটি গবেষণা করে পরমাণু শক্তি গবেষণা ইনস্টিটিউট। ২০১৭ সালে ওই গবেষণার তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে নতুন একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ৩৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী এস. এম. দিদারুল ইসলাম।

এতে সহগবেষক হিসেবে বিভাগের সভাপতি মো. আমির হোসেন ভূঁইয়া, দিদারুলের স্ত্রী ভূতাত্ত্বি বিজ্ঞান বিভাগের ৪০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী তানজিনা রুমী এবং পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ৪০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী গাউসুল আজমের নাম রয়েছে।

এদের বিরুদ্ধে উপাচার্য বরাবরে গবেষণা জালিয়াতির লিখিত অভিযোগ দেন পরমাণু শক্তি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য ভূতত্ত্ববিদ তপন কুমার মজুমদার।

অভিযোগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, ওই চারজন ‘হাইড্রোজিওকেমিক্যাল ইনভেস্টিগেশন অব গ্রাউন্ড ওয়াটার ইন শ্যালো কোস্টাল অ্যাকুইফায়ার অব খুলনা ডিস্ট্রিক্ট, বাংলাদেশ’ শীর্ষক এ গবেষণা প্রবন্ধ ‘অ্যাপ্লাইড ওয়াটার সায়েন্স’ জার্নালের অনলাইন সংস্করণে গত ১৬ জানুয়ারি প্রকাশ করেন।

লেখকরা মূলত এ প্রবন্ধে পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে প্রকাশিত ‘স্টাডি অন দ্য ইম্প্যাক্ট অব সি-ওয়াটার ইনট্রুশন অন কোস্টাল অ্যাকুইফায়ারস অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রবন্ধের তথ্য-উপাত্ত হুবহু তুলে দিয়েছেন। এ প্রবন্ধের প্রথম লেখক ছিলেন রতন কুমার।

জানা যায়, আসল প্রবন্ধের তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে দু’বার ভিন্ন ভিন্ন নামে দু’টি জার্নালে প্রবন্ধ প্রকাশের চেষ্টা করেছেন অভিযুক্ত দিদারুল। ঘটনাক্রমে দু’টি জার্নালই প্রবন্ধ রিভিউর জন্য তপন কুমারের কাছে প্রবন্ধটি পাঠায়।

এ বছর মাঝামাঝি সময়ে তারা চারজন ‘আর্থ পারস্পেকটিভ’ জার্নালে এসব তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে প্রবন্ধ প্রকাশের জন্য পাণ্ডুলিপি জমা দেয়। তপন কুমার মজুমদার মূল্যায়ণ করতে গিয়ে এ ঘটনা দেখেন বলে জানান।

তপন কুমারের কাছে জালিয়াতি ধরা পড়লে প্রবন্ধটি বাতিল করে দেয় জার্নাল। পরবর্তীতে অন্য আরেকটি জার্নালে প্রবন্ধটি জমা করলে তারা প্রকাশ করে।

প্রবন্ধ দু’টির প্রাথমিক তুলনামূলক পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দুটির সারাংশ, প্রধান শব্দ, গবেষণা এলাকা, গবেষণা পদ্ধতি, একাধিক তথ্য এবং উপসংহারে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। এ ছাড়া পানির কিছু রাসায়নিক উপাদান বিশ্লেষণের জন্য আয়ন ক্রোমোটোগ্রাফি করেছেন বলে উল্লেখ রয়েছে প্রবন্ধে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগে আয়ন ক্রোমোটোগ্রাফির কোনো যন্ত্র ছিল না।

তপন কুমারের অভিযোগ আমলে নিয়ে ২০১৭ সালে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে সিন্ডিকেট। তদন্তে জালিয়াতির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় ৩ আগস্টের সিন্ডিকেট অধিকতর তদন্তের জন্য অধ্যাপক আমির হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করে এবং উপাচার্যের নেতৃত্বে একটি স্ট্রাকচার কমিটি গঠন করে। বাকি অভিযুক্তদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রত্ব না থাকায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে বাকি তিন অভিযুক্তই দেশের বাইরে রয়েছেন।

অধ্যাপক আমির হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আমি এ বিষয়টা জানতামই না। প্রধান গবেষক দিদারুল অনার্স-মাস্টার্সে শিক্ষক জামাল উদ্দিন রুনু ও হাফিজুর রহমানের অধীনে ছিল। আমার সঙ্গে কোনো সংযোগই ছিল না। অনলাইন জার্নালে পেপার জমা করতে যেহেতু সহগবেষকের সম্মতিপত্র লাগে না, সে আমাকে না জানিয়েই আমার নাম দিয়ে দিয়েছে। আমি তাকে বলার পর সে ওই পেপার উঠিয়েও নিয়েছে। এরপর আবারও অন্য জায়গায় সে এটা প্রকাশ করেছে। পরে দেখি আমার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এটা খুবই দুঃখজনক, আমি আসলে চক্রান্তের শিকার।

অন্য অভিযুক্তরা দেশের বাইরে থাকায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। তবে ২০১৭ সালে অভিযুক্তরা গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেছিলেন তারা কোনো জালিয়াতি করেননি।

লোকপ্রশাসনের শিক্ষক আশরাফুল হকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে জানা যায়, আশরাফুল বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির পাশাপাশি আরেকটি প্রতিষ্ঠানে পূর্ণকালীন চাকরিরত রয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী কোনো শিক্ষক ছুটি না নিয়ে একই সঙ্গে আরেক প্রতিষ্ঠানে পূর্ণকালীন চাকরি করতে পারেন না, অনুমতি সাপেক্ষে কেবল খণ্ডকালীন চাকরি করতে পারেন।

কিন্তু আশরাফুল ইসলাম ইনোভেশন ফর পোভার্টি অ্যাকশন নামের একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত রয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে, যা একটি পূর্ণকালীন চাকরি। এ বিষয়ে ২০১৭ সালে আশরাফুলের বিরুদ্ধে উপাচার্যের নেতৃত্বে ৭ সদস্য বিশিষ্ট একটি ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় এবং আশরাফুল কমিটির কাছে দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চান। এর মাঝে গত বছরের জানুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদত্যাগের আবেদন জানান। পরে আবার এপ্রিল মাসে পদত্যাগ প্রত্যাহারের আবেদন করেন এই শিক্ষক। তবে সিন্ডিকেট পদত্যাগ প্রত্যাহারের আবেদনকে গণ্য না করে পদত্যাগের আবেদনকেই মঞ্জুর করে। ইনোভেশন ফর পভার্টি অ্যাকশনের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা গেছে আশরাফুল এখনো প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত আছেন।

এ ব্যাপারে উপাচার্য ফারজানা ইসলাম বলেন, অভিযোগ ওঠার পরও তিনি চাকরিটি ছাড়েনি। এখনো ওই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছে তিনি। এ কারণেই তার পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের আবেদনের ব্যাপারে সহমর্মিতা দেখায়নি সিন্ডিকেট। তবে সে ছয় মাসের মধ্যে রিভিউ আবেদন করতে পারবে।

তবে আশরাফুলের চাকরি পুনর্বিবেচনার জন্য বিভাগটির সভাপতিসহ কয়েকজন শিক্ষক উপাচার্যের কাছে সুপারিশ করেছেন। বিভাগের সভাপতি সহযোগী অধ্যাপক জেবউননেছা বলেন, আশরাফুল খুবই মেরিটোরিয়াস। অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলেও সে বিভাগে কর্তব্য পালনে অবহেলা করেনি। আমাদের বিভাগে এমনিতেই শিক্ষক সংকট। পরীক্ষা কমিটির সভাপতি, ছাত্র উপদেষ্টাসহ সে কয়েকটি দায়িত্বপালন করছে। তার চাকরি চলে গেলে বিভাগের কয়েক শ শিক্ষার্থী বিপাকে পড়বে।

(Visited 1 times, 1 visits today)
Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

12 + nine =