Templates by BIGtheme NET
Home / slider / বিদায় জন ম্যাককেইন

বিদায় জন ম্যাককেইন

Loading...

পরিবারের প্রিয়মুখগুলি অন্তিম সময়ে তাহার পাশেই ছিল। অ্যারিজোনার সেডোনার নিকটবর্তী খামারবাড়িতে বিষাদের ছায়া দীর্ঘ হইতেছিল ক্রমশ। অবশেষে গত শনিবার ৮১ বৎসর বয়সে জাগতিক সকল বন্ধনের ঊর্ধ্বে চলিয়া গেলেন মার্কিন সিনেটর জন ম্যাককেইন। ইহার সহিত শেষ হইল এক বৎসরের বেশি সময় ধরিয়া মস্তিষ্কের ক্যান্সারের সহিত তাহার অসম লড়াই।
যেই বৎসর ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনে অবতীর্ণ হন, সেই সময় ট্রাম্প ‘আমেরিকাই প্রথম’-এর মতো একটি স্থূল স্লোগানকে আঁকড়াইয়া ধরিয়াছিলেন। বিশ্বের সুপার পাওয়ার দেশ হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র ইতোপূর্বে বাকি বিশ্বের সহিত বিভিন্ন ধরনের প্রতিশ্রুতি, নৈতিক ও চুক্তিমূলক অবস্থান গ্রহণ করিয়াছে। এইসকল মহৎ কাজে যাহারা বিশেষভাবে অবদান রাখিয়াছেন জন ম্যাককেইন তাহাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি সেই সকল মার্কিন সিনেটরের একজন, যিনি ‘সর্বজনীন আমেরিকা’র জন্য কয়েক ডজনের বেশি আন্তর্জাতিক সফর করিয়াছেন, মিত্রদের সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছেন এবং ছুটিয়াছেন বিশ্বময়। কিন্তু ট্রাম্পের ‘আমেরিকাই প্রথম’ জাতীয় নীতি বাকি বিশ্বের প্রতি আমেরিকার সর্বজনীন নীতিকেই উপেক্ষা করিয়াছে তীব্রভাবে।
ইহার বিপরীতে আমরা দেখিয়াছি জন ম্যাককেইনের দৃঢ় অবস্থান। সর্বজনীন তথা বৈশ্বিক নীতিমূল্যবোধের পতাকা সমুন্নত রাখিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সেই নীতিমূল্যবোধ হইল ন্যায়বিচারের, স্বাধীনতার, গণতন্ত্রের, ন্যায্যতা তথা ন্যায়পরায়ণতার, নৈর্ব্যক্তিকতা তথা নিরপেক্ষতার। ইহার সপক্ষে আমেরিকার প্রশাসনের যে আবহমান ভূমিকা আমরা দেখিয়াছি, ট্রাম্পের ‘আমেরিকাই প্রথম’ স্লোগানটি সেই সর্বজনীন নীতিমূল্যবোধের বিপরীতে হুমকি হইয়া দেখা দেয়।
অ্যারিজোনা রাজ্য হইতে নির্বাচিত ছয়বারের সিনেটর জন ম্যাককেইন দুই দফায় প্রেসিডেন্ট পদে লড়িয়াছেন ২০০০ ও ২০০৮ সালে। ইহার মধ্যে ২০০৮ সালে তিনি তাহার দল রিপাবলিকান পার্টি হইতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়াই করেন। যদিও হোয়াইট হাউসের দ্বার তাহার জন্য উন্মুক্ত হয় নাই একটিবারও। কিন্তু আমরা দেখিতে পাই, তাহার পুরো জীবনটাই যেন আমেরিকার মূল্যবোধে ঋদ্ধ একটি চমৎকার পাঠ্যবই। দেশের প্রতি তাহার আনুগত্যের অপূর্ব দৃষ্টান্ত আমরা দেখিতে পাই ভিয়েতনামের যুদ্ধের সময়ে। বৈমানিক যোদ্ধা হিসাবে সেই সময়ে তিনি আহত হন। তাহার বিমান ভূপাতিত হয়, অতঃপর পাঁচ বৎসর বন্দিজীবন কাটাইতে হয় তাহাকে। এইসময় তাহার অবিসংবাদিত মর্যাদাবোধের পরিচয় দেখিতে পাই আমরা। প্যাসিফিক বহরের ইউএস কমান্ডারের পুত্র হইবার কারণে তাহাকে বিশেষ সুবিধায় আরো পূর্বেই মুক্তি দিতে চাহিলে তিনি তাহা প্রত্যাখ্যান করেন। ইহা একইসঙ্গে অত্যন্ত সাহসোচিত একটি দৃঢ়তাও বটে। কারণ, দীর্ঘদিনের বন্দিদশার নিপীড়নকে তুচ্ছজ্ঞান করিবার ধৈর্য ও সাহস দেখাইয়াছেন তিনি। ইহার কয়েক দশক পর আমরা অত্যন্ত বিস্ময়ের সহিত দেখিতে পাই, ভিয়েতনামের সহিত আমেরিকার স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরিতে ম্যাককেইনের ইতিবাচক ভূমিকা। স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরির জন্য তিনি কর্মজীবনের শেষাবধি ভিয়েতনাম সফর করিয়াছেন বারংবার।
আজকের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ স্লোগানের যেই অন্তর্নিহিত অর্থ প্রকাশ পায়, ম্যাককেইন বহুপূর্বেই তাহার নির্বাচনী প্রচারণার স্লোগান হিসাবে ব্যবহার করিয়াছেন ‘কান্ট্রি ফার্স্ট’ কথাটি। তবে সেই ‘কান্ট্রি ফার্স্ট’ কথাটির মধ্যেই অন্তর্নিহিত রহিয়াছে আমেরিকার যথার্থ স্বার্থ। আর তাহা হইল, আমেরিকার সমৃদ্ধি ও বাক-স্বাধীনতা অর্জিত হইয়াছে অন্যদের সকলের সহযোগিতায়। একজনের পরাজয় যখন অপরজনের অর্জনের সমান হইয়া যায়, জন ম্যাককেইন সেই জিরো-সাম (zero-sum) জগতের বাসিন্দা নন। বরং তিনি সেই জগতের বাসিন্দা যেখানে একটি রাষ্ট্রের (আমেরিকার) সমৃদ্ধি ঘটিয়াছে পারস্পারিকভাবে এবং সকলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে।
জন ম্যাককেইন আজ আর নাই, কিন্তু এই বিশ্বের নানাপ্রান্তে এমন অসংখ্য মানুষ রহিয়াছেন যাহারা ম্যাককেইনের কর্ম ও দর্শনের ভিতরে আজ নূতন আশার আলোকবর্তিকা দেখিতে পান, যাহা প্রকাশিত হইতেছে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণের এই অনিশ্চয়তার যুগে।
বলিবার অপেক্ষা রাখে না, তাহার জীবনাবসান এই বিশ্বের জন্য অত্যন্ত শোকাবহ একটি ঘটনা। বাংলাদেশ হইতে আমরা তাহার পরিবারের সদস্যদের মতোই ধারণ করিতেছি এই শোক। কারণ তাহার পরিবারের একজন সদস্য এই বাংলাদেশেরই সন্তান। মহাত্মা জন ম্যাককেইন ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের এক এতিম কন্যাশিশুকে দত্তক নিয়াছিলেন পিতা হিসাবে। বাংলাদেশি হিসাবে আমরা ব্রিগেট ম্যাককেইন নামের সেই তরুণী কন্যার পিতৃবিয়োগের শোক ভাগ করিয়া লইতে চাই। একই সঙ্গে জন ম্যাককেইনের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।
Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

two × four =