Templates by BIGtheme NET
Home / slider /
সিলেট সিটির রাজনীতি আওয়ামী লীগ
সবাই দুষছেন কামরানকে

সিলেট সিটির রাজনীতি আওয়ামী লীগ
সবাই দুষছেন কামরানকে

Loading...

সিলেটে ভোটে হারার কষ্ট আওয়ামী লীগকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। হতাশায় ভুগছে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। সিটি নির্বাচনে সব চেষ্টার পরও দলীয় মেয়র প্রার্থীর পরাজয় মেনে নিতে পারছে না তারা। এ জন্য একে অন্যকে দোষারোপও করছে। শীর্ষস্থানীয় নেতাদের পরস্পরের প্রতি সন্দেহ ও অবিশ্বাসের বিষয়টি এখন প্রকাশ্যেই এসে গেছে। সাংগঠনিক দুর্বলতা, নেতৃত্বে কোন্দলের পাশাপাশি দলীয় প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ সংকট পরাজয়ের অন্যতম কারণ বলে মনে করছে কেউ কেউ। এ অবস্থায় দলে নেতৃত্ব সংকটের বিষয়টি জোরেশোরেই উচ্চারিত হচ্ছে। সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এবার আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী হতে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ পাঁচ নেতা আগ্রহী ছিলেন। শেষ পর্যন্ত দলের মনোনয়ন পান মহানগর সভাপতি ও সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর কাছে হেরে যান আওয়ামী লীগের প্রার্থী কামরান। এর আগের নির্বাচনেও আরিফের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন কামরান। ২০১৩ সালের সেই নির্বাচনের প্রায় তিন সপ্তাহ পর সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে দলের নেতাকর্মীরা পরাজয়ের কারণ তুলে ধরেছিল। সেই বৈঠকে মহানগর আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্যরা বলেছিলেন, জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যু ছাড়াও স্থানীয় অনেক কারণে সিলেট সিটি নির্বাচনে দলের প্রার্থীর ভরাডুবি হয়েছে। দৃশ্যমান উন্নয়ন না হওয়া, প্রশাসনের ব্যর্থতা এবং দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকেই পরাজয়ের জন্য বেশি দায়ী করেছিলেন তাঁরা।

এবার নির্বাচনে হারের পর এখনো দলীয়ভাবে কোনো মূল্যায়ন সভা হয়নি। তবে বিভিন্ন নেতা দলের প্রার্থীর পরাজয়ের জন্য নানা কারণ তুলে ধরেছে। যদিও গত নির্বাচন আর এবারের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। এবার দলীয় প্রতীকে মেয়র পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের শুরু থেকেই দলের নেতাকর্মীরা মাঠে ছিল। যা আগের নির্বাচনে দেখা যায়নি। তা ছাড়া নির্বাচনের দিন বিভিন্ন কেন্দ্র দখল, ব্যাপক হারে জাল ভোটের পরও দলের প্রার্থীর জয় নিশ্চিত করা যায়নি। আর এ কারণে দলের ভেতরে-বাইরে অসন্তোষ বিরাজ করছে। দলের কর্মীরা মাঠে থাকলেও নেতাদের আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা দৃশ্যত মাঠে থাকলেও তাঁরা আন্তরিকভাবে কাজ করেননি। একে অপরের প্রতি এমনই সন্দেহ ও অবিশ্বাস প্রকাশ পাচ্ছে তাদের কথাবার্তায়। তবে সব কিছু ছাপিয়ে দলের যোগ্য নেতৃত্বের অভাবকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে নেতাকর্মীরা। তাদের মতে, নেতৃত্ব ঠিক থাকলে অন্য সমস্যাগুলো থাকত না।

প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নেতৃত্ব নির্বাচনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নেই সিলেট আওয়ামী লীগ। সব শেষ ২০০৫ সালে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু কোন্দলের কারণে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন সম্ভব হয়নি। তিন বছর মেয়াদের সেই কমিটি ছয় বছর দায়িত্ব পালনের পর ২০১১ সালে সম্মেলন ছাড়াই কমিটি আসে কেন্দ্র থেকে। এই কমিটিও সাত বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছে। টানা দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় থাকা দেশের প্রাচীন এই দলটির সিলেটে কোনো নিজস্ব কার্যালয় পর্যন্ত নেই। প্রকাশ্যে দলীয় কোন্দল না থাকলেও দলের ভেতর রয়েছে নানা মেরুকরণ। ত্যাগী নেতাকর্মীদের কোণঠাসা অবস্থা এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা নিয়েই চলছে আওয়ামী লীগের রাজনীতি।

আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীর মতে, সিলেটে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ আছে কিন্তু সংগঠন বলতে যা বোঝায় সেটি নেই। তাদের মতে, সিলেট আওয়ামী লীগ এখন অনেকটা অভিভাবকহীন। একসময় দলের হাল ধরা জাতীয় নেতা আব্দুস সামাদ আজাদ, স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, দেওয়ান ফরিদ গাজীর মতো নেতার শূন্যতা এখন তিলে তিলে অনুভব করছে নেতাকর্মীরা। বর্তমানে দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে পদবিধারী অনেক নেতা থাকলেও সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে সংগঠনকে চাঙ্গা করার মতো নেতৃত্ব গড়ে ওঠেনি বলেই মনে করে দলের অধিকাংশ নেতাকর্মী। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের ওপর কারো যেন নিয়ন্ত্রণ নেই। সংগঠনে চেইন অব কমান্ড অনেকাংশে দিকহারা।

একসময় সিলেট আওয়ামী লীগে প্রকাশ্যে বিভক্তি থাকলেও সংগঠন ছিল চাঙ্গা, নিয়ন্ত্রণ ছিল কেন্দ্রীয় নেতাদের হাতে। এখন কেন্দ্রীয় নেতা আছেন, কিন্তু নেই আগের জৌলুস। ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া নিয়ে নেতায় নেতায় দ্বন্দ্ব থাকায় নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলছে সাংগঠনিক কার্যক্রম। জাতীয় দিবসকেন্দ্রিক কর্মসূচি ছাড়া দলীয় কার্যক্রম অনেকটা স্থবির। গত বছরের মার্চে সিলেটে আওয়ামী লীগের বিভাগীয় প্রতিনিধি সম্মেলন এবং পরবর্তী সময়ে দলের কেন্দ্রীয় সম্মেলনকে কেন্দ্র করে সিলেটে দলে কিছুটা চাঙ্গাভাব লক্ষ করা যায়। কিন্তু দল গোছানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি।

সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের ২৭টি ওয়ার্ড কমিটির অধিকাংশতেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই। ২২টি ওয়ার্ডে সম্মেলন হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা সম্ভব হয়নি। পাঁচটি ওয়ার্ডে সম্মেলনই হয়নি। এবারের নির্বাচনে সাতটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগের দলীয় কোনো প্রার্থীই ছিলেন না। আওয়ামী লীগের নেতারা আগে সহযোগী সংগঠনগুলোকে দেখভাল করতেন। এখন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর ওপর ভর করে রাজনীতি করতে হচ্ছে সিলেটের আওয়ামী লীগ নেতাদের।

সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদউদ্দিন আহমদ বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী কোনো মূল্যায়ন সভা তাঁরা এখনো করেননি। তবে দলে অনৈক্য আছে এমনটি তিনি মনে করেন না। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে জয়ী হতে তিনটি বিষয়ের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হচ্ছে—দল, প্রতীক এবং প্রার্থী। দলীয়ভাবে আমরা ঐক্যবদ্ধ ছিলাম। আমাদের প্রতীক নৌকাও ছিল। কিন্তু আমাদের প্রার্থীকে ভোটাররা গ্রহণ করেনি। কারণ নির্বাচনে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ একটি বড় বিষয়।’ নগর আওয়ামী লীগের এই শীর্ষ নেতার মতে, গত পাঁচ বছরে সিটি করপোরেশন উন্নয়ন খাতে প্রচুর বরাদ্দ পেয়েছে। মেয়র থাকার সুবাদে আরিফুল হক চৌধুরী প্রচুর দৃশ্যমান কাজ করে একটা ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছেন। কিন্তু আমাদের প্রার্থী নিজেকে সেভাবে তুলে ধরতে পারেননি। ভাবমূর্তির ক্ষেত্রে এই ফারাকই নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে।’ তবে এসব ত্রুটি-বিচ্যুতি অনুসন্ধান করে ভবিষ্যৎ জাতীয় নির্বাচনের জন্য তাঁরা প্রস্তুত হবেন বলে তিনি জানান।

মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বিজিত চৌধুরী বলেন, ‘গত সাত বছরেও নগরের ২৭টি ওয়ার্ডে শক্তিশালী কমিটি গঠন করতে না পারা, প্রার্থীর ইমেজ সংকট, প্রচুর সমর্থক থাকার পরও দুর্বল সাংগঠনিক কাঠামো এবং নির্বাচনের কৌশল নির্ধারণে ভুলের কারণেই এই পরাজয় ঘটেছে। এ ছাড়া দলের দু-চারজন পদধারী নেতার আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। নেতাকর্মীরা হতাশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সার্বিকভাবে এতে দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দলের প্রার্থীর পরাজয় এবং সাংগঠনিক অবস্থা নিয়ে হতাশ মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ আনোয়ার হোসেন রানা। তিনি বলেন, ‘দলের নেতাকর্মীরা দিনরাত কাজ করেছে। তার পরও আমরা পরাজিত হয়েছি। এটা হতাশার।’ সাংগঠনিক দুর্বলতার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে আমরা দলকে সংগঠিত করতে ব্যর্থ হয়েছি। নতুবা এমনটি হতো না।’ এর দায়ভার তিনি নিজেও কোনোভাবে এড়াতে পারেন না মন্তব্য করে বলেন, তিনি মহানগর কোষাধ্যক্ষের পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং শিগগিরই সেটি করবেন।

‘সিলেটে দল হারেনি, ব্যক্তি প্রার্থী হেরেছে’ এমন মন্তব্য করে দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ বলেন, ‘ব্যক্তি ইমেজ সংকটের কারণে মেয়র পদে দলের প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। তিনি বলেন, দল ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেছে। কিন্তু দলীয় প্রার্থীর জামায়াত সংশ্লিষ্টতা, সংগঠন গোছাতে না পারার কারণেই আমরা হেরেছি।’

এ ব্যাপারে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদরউদ্দিন আহমদ কামরান বলেন, ‘যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন আমরা জাতীয় নির্বাচনের জন্য দলকে সংগঠিত করব।’ নিজের ইমেজ সংকটের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এটা ঠিক না। ইমেজ সংকট থাকলে এত ভোট পেলাম কিভাবে? যারা এসব বলছে তারা নির্বাচনে আমার বিরোধিতা করেছে।’

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

two × five =