যন্ত্রণার নাম ব্লু হোয়েল-সারাহাহ!

ফেসবুকে ভাইরাল ব্লু হোয়েল নামের একটি গেম। অনেকেই কৌতূহলের বশে অনলাইনে তন্ন তন্ন করে খুঁজেছেন গেমটি। কিছুদিন আগ পর্যন্ত সারাহাহ নামের একটি অ্যাপ নিয়েও এ রকম মাতামাতি দেখা গেছে। নাম-পরিচয় গোপন করে কথা বলার সুবিধা আর ভয়াবহ অভিজ্ঞতার আকর্ষণই কি এর কারণ? নাকি এর অন্য কোনো কারণ আছে? সাইবার দুনিয়ায় নিপীড়নের নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে সারাহাহ আর ব্লু হোয়েল। অল্প বয়সীরা নতুনের ফাঁদে পড়ে নিপীড়নের শিকার হচ্ছে বেশি। পরিচয় গোপন করে কাউকে কিছু বলার সুবিধা দেয় সারাহাহ নামের নতুন অ্যাপটি। কিশোর-কিশোরীদের দুর্বলতা, বিশেষ করে একাকিত্বের সুযোগ নিয়ে ব্লু হোয়েল গেম আত্মহত্যার প্ররোচনা দেয়।

নিপীড়নের ফলে মৃত্যু, বিশেষ করে আত্মহননের ঘটনার অভিজ্ঞতা সবাই শুনেছেন। সাইবার নিপীড়নের ফলেও আত্মহত্যার ঘটনার উদাহরণ রয়েছে। সাইবার দুনিয়ায় নিপীড়নের দুটি নতুন টুল হিসেবে এসেছে সারাহাহ আর ব্লু হোয়েল। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এ দুটি বিষয় নিয়ে তুমুল আলোচনা ছড়িয়েছে। গত কয়েক মাসে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভাইরাল হয় সারাহাহ নামের প্রতিক্রিয়া জানানোর অ্যাপটি। সম্প্রতি নিউজফিডজুড়ে ব্লু হোয়েল নামের গেমটি আলোচনার বিষয়। সারাহাহ আর ব্লু হোয়েল নিয়ে কেউ ট্রল করেছেন, কেউবা স্ট্যাটাস দিচ্ছেন। এগুলো নিয়ে ভুয়া বার্তাও ছড়াচ্ছে।

সারাহাহ আরবি শব্দ। এর অর্থ সৎ বা অকপটতা। কর্মক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া জানানোর ওয়েবটুল হিসেবে সারাহাহর ব্যবহার শুরু হয়েছিল। সারাহাহ হচ্ছে নাম-পরিচয় গোপন করে বার্তা পাঠানোর অ্যাপ। যখন কোনো ব্যবহারকারী অ্যাপটিতে নিবন্ধন করেন, তাঁরা বন্ধুদের লিংক পাঠাতে বা অনলাইনে তা পোস্ট করতে পারেন। ওই লিংক ব্যবহার করে যে-কেউ গোপন বার্তা পাঠাতে পারেন। প্রেরকের পরিচয় জানার কোনো সুযোগ প্রাপকের কাছে থাকে না। প্রাপক সরাসরি অ্যাপের মাধ্যমে কোনো জবাব দিতে পারেন না। অ্যাপের মাধ্যমে পাওয়া বার্তাটির উত্তর দিতে হলে অন্য কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তাটি শেয়ার করে তারপর তাঁকে উত্তরটি দিতে হবে। অ্যাপটি তৈরি করেছেন সৌদি আরবের তরুণ ডেভেলপার জায়ান আল-আবিদিন তৌফিক। তাঁর ভাষ্য, খুব সরল উদ্দেশ্যে তিনি এটি তৈরি করেছেন। কিন্তু অনলাইন দুনিয়ায় সারাহাহ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে।

ব্লু হোয়েল গেমটি কোনো অ্যাপ বা অনলাইনে সরাসরি পাওয়া যায় না। এটি কোনো যোগাযোগ চ্যানেলের মাধ্যমে খেলতে হয়। এতে নাম-পরিচয় গোপন করে চ্যালেঞ্জদাতা বা অ্যাডমিন তার লক্ষ্যের বা গেমারের কাছে পৌঁছান। ওই আগ্রহী গেমারকে কিছু টাস্ক বা কাজ সম্পন্ন করার জন্য ধাপে ধাপে চ্যালেঞ্জ দেন অ্যাডমিন। যার মধ্যে নিজেকে আহত করার বিভিন্ন কাজ থাকে। শেষ ধাপে গেমারকে নিজের জীবন দিতে বলা হয়।

সারাহাহর সঙ্গে ব্লু হোয়েল গেমের তুলনা চলে না। কারণ, সারাহাহ প্রতিক্রিয়া জানানোর অ্যাপ। তবে এটিও একেবারে নিরীহ নয়। এ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ফিডব্যাক বা প্রতিক্রিয়ার নামে কাউকে নিপীড়ন চালাতে পারে দুর্বৃত্তরা। এ অ্যাপটি থেকে পাওয়া প্রতিক্রিয়া মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। নিজের জীবনকে অর্থহীন মনে হতে পারে। সাইবার নিপীড়নের ভুক্তভোগী হতে হয়। মানসিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সারাহাহর মতো অ্যাপ নিরীহ নয়। এর প্রতিক্রিয়া বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। অনিরাপদ পরিবেশে যে-কেউ নিজের বিপদ ডেকে আনতে পারেন। ব্লু হোয়েল তো সরাসরি মানসিক যন্ত্রণাদায়ক।

সাইবার দুর্বৃত্তরা কৌশলে সাইবার দুনিয়ার নানা টুল বা উপকরণ কাজে লাগিয়ে মানুষকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করে। এগুলো নিয়ে মানুষকে যত কৌতূহলী করে তোলা যায়, ততই তাদের জন্য সুবিধা। ব্লু হোয়েল গেমটির ক্ষেত্রে ঠিক সে ধরনের ঘটনা ঘটেছে। অনেকেই কৌতূহলী হয়ে অনলাইনে এর খোঁজ করছেন। ফলে অনেকেই ভুয়া ও ক্ষতিকর সফটওয়্যার ডিভাইসে ইনস্টল করে ফেলেছেন। কৌতূহল ডেকে আনছে বিপদ।

সাইবার নিপীড়ন কী? সাইবার বুলিং বা সাইবার নিপীড়ন হলো তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ভার্চ্যুয়াল জগতে কাউকে উৎপীড়ন করা। অন্যভাবে বললে, সাইবার বুলিং হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তির নেতিবাচক ব্যবহার, যা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ, আঘাতমূলক আচরণকে উৎসাহিত করে। একে অনেকে সাইবার স্টকিংও বলে থাকেন। অনলাইন বা সামাজিক যোগাযোগের প্ল্যাটফর্মে কেউ কোনো বিষয়ে চাপ বা হুমকি দিলে তা এর আওতায় পড়ে। নির্দিষ্ট আলোচনার প্ল্যাটফর্মের বাইরে যাওয়ার প্ররোচনা দিলে তাও নিপীড়নের দিকে নিয়ে যেতে পারে। কোনো অ্যাপ বা গেমে যদি ব্যবহারকারীর অনিচ্ছাকৃত বিষয়গুলো ফাঁস করার নামে ব্ল্যাকমেল করা হয়, তবে তা সাইবার নিপীড়নের পর্যায়ে পড়ে। নিপীড়নের বিভিন্ন মাত্রা আছে। চূড়ান্ত পর্যায়ে মৃত্যুঝুঁকি চলে আসে বলে নিপীড়নকে হালকা করে দেখার অবকাশ নেই।

সাইবার নিপীড়নের ফলে মানুষের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে দেখা যায়। কাউকে লজ্জা দেওয়া, বিকৃত করা বা ব্ল্যাকমেল করে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেওয়ার মতো ঘটনা এখন অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোয় ঘটছে নিয়মিত। মানসিকভাবে নাজুক অবস্থায় থাকা অনেকেই এর শিকার হন। উদ্বেগ আর হতাশা থেকে অনেকেই অনলাইনে আশ্রয় নেন। সেখানে খুঁজে ফেরেন বন্ধুত্ব। সাইবার নিপীড়নের শিকার হয়ে মারাত্মক বিপদের ঝুঁকিতে পড়েন অনেকেই।

যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক মনোবিজ্ঞানী রনেট কোচেনের ভাষ্য, এখন নিপীড়কেরা কোনো মাধ্যমে সীমাবদ্ধ থাকে না। যেকোনো পথ বা উপায়ে টার্গেট ধরে নিপীড়ন চালাতে পারে। ইন্টারনেট তাদের সে সুযোগ করে দিয়েছে। বেশি মানুষের কাছে পরিচয় গোপন করে পৌঁছানোর সুবিধা এখন নিপীড়কের কাছে। অ্যাপ্লিকেশন বা সুবিধা ইতিবাচক উদ্দেশ্যে তৈরি করা হলেও এর প্রভাব অনেক সময় মারাত্মক হতে পারে। মানুষের আচরণে পরিবর্তন ফেলতে পারে।

অবশ্য সারাহাহ আর ব্লু হোয়েলের বিষয়টি যেভাবে ছড়িয়েছে তা অতিরঞ্জিত। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এ বিষয়গুলো কৌতুক হিসেবে নিয়েছেন, ট্রল করেছেন। অনেকের কাছে ব্লু হোয়েল গেম খেলে আত্মহত্যার বিষয়টিকে বিশ্বাস করা কঠিন মনে হয়েছে। মনোবিজ্ঞানী রনেট বলেন, কোনো কিছু পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে তা ভিন্ন ভিন্ন রূপে হাজির হতে পারে। এর পরিবর্তে এ ধরনের আকর্ষণে যাতে তরুণেরা ছুটে না যায়, তার বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণেরা যাতে একাকিত্ব অনুভব না করে, এ জন্য তাদের বিকল্প ব্যবস্থা গড়তে হবে। তাদের বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে। নিপীড়কদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে অনলাইনে সাপোর্ট গ্রুপে যুক্ত করা, অনলাইন কমিউনিটিতে যুক্ত রাখা যেতে পারে। তরুণদের যথাযথ তত্ত্বাবধান করতে পারলে ও অনলাইন দুনিয়ায় নিপীড়কদের বিরুদ্ধে লড়তে সহযোগিতা করতে হবে। ভুক্তভোগীদের কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনতে ও সাহায্যের হাত বাড়াতে হবে।

যাঁরা সারাহাহ বা ব্লু হোয়েলের আকর্ষণ কাটাতে পারছেন না, তাঁদের জন্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৌতূহল থেকে এ ধরনের টুল ব্যবহার প্রলুব্ধ হওয়া ঠিক হবে না। সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি সাইবার নিপীড়নের বিষয়টি বুঝতে পারলে ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে শেয়ার করতে হবে। প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাহায্য নিতে হবে। যে অ্যাপ থেকে বিপদের ঝুঁকি বাড়বে, তা ডিভাইস থেকে আনইনস্টল করে ফেলতে হবে। প্রয়োজনবোধে মানসিক চিকিৎসা নিতে হবে।

মিন্টু হোসেন : সাংবাদিক

ad
ad

ফেসবুক থেকে সর্বশেষ

ad
ad

ফেসবুক থেকে সর্বাধিক পঠিত

আগের সংবাদ