নীলের খেলায় বিলীন?

বেদনার রং নীল। বিষণ্ণতার রংও কি নীল, নাকি ধূসর ? জীবনকে যারা ধূসর ভাবে, বেদনা বা দুঃখবোধের জন্য যারা বিষণ্ণতায় ডুবে যায় তাদের কেন যেন ‘নীল’ আকর্ষিত করে। তারা আসক্ত হয়ে পড়ে নীল রঙে। আমাদের স্কুল বেলাতেও চারদিকে নীলাভ রং দেখেছি। কিন্তু শুনেছি আমাদের বড়রা আমাদের সোনালী রঙের তেপান্তরের মাঠ তৈরি করে দেবেন। কিন্তু আমরা দেখেছি নীল কুয়াশা। সেই সময়ে ইন্টারনেট ছিল না। সুযোগ ছিলনা অন্তর্জালে হারিয়ে যাওয়ার।কিন্তু নীল ছবি ছিল আমাদের কৈশোরকে বিষণ্ণ করে দিতে। নীলছবির নেশার ইশারা আমাদের কৈশোরকে বিশৃঙ্খল করেছে। বাড়ি বাড়ি ভিসিপি, ভিসিআরের মাধ্যমে নীল ছবি ছড়িয়ে পড়েছিল।

নীলছবি থেকে কৈশোরের মুক্তি হয়নি। এখন ব্লুটুথ, ইউটিউব, ইমো, ভাইবার, পেনড্রাইভে নীল ছবি আরো নীলাভ হয়ে এসেছে শিশু কিশোরদের কাছে। তারাই এখন সেই নীল ছবির পণ্য। সাইবার অপরাধের নীল গালিচায় ডুবে যাচ্ছে ওরা। নীলছবির সঙ্গে স্কুল বেলায় মাদক এসেছিল সহজ ভাবেই। সুলভ মাদক । কত নাম-হেরোইন, পেথেড্রিন, ফেনসিডিল হয়ে ইয়াবা। নেশার আরো অনেক নাম আছে। সেই নামগুলো আমাদের কিশোর-তরুণদের ভয়ঙ্কর নীলের অতলে নিয়ে যাচ্ছে।

তবে মাদকের নেশার চেয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে আমাদের অন্তর্জালে ভেসে থাকার নেশা। মোবাইল, ল্যাপটপ, আইপ্যাড, কম্পিউটারের মাধ্যমে আমরা সর্বক্ষণ অন্তর্জালে ভেসে থাকছি। খুব কম মূহূর্তই আছে আমরা এসব ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ছাড়া থাকতে পারছি। ডিভাইস ছাড়া সময়গুলো আমরা অস্থির এবং চঞ্চল হয়ে উঠি। এই অস্থিরতা এবং চাঞ্চল্যে যে বুড়োরা একাই আছি তা নয়। বাচ্চা-কাচ্চাসহই ঝাঁপ দিয়েছি সেই বিষণ্ণতার জলে। যে জলে আমাদের ছেলেমেয়েরা দেখছে পৃথিবী কত রঙিন। তার প্রতিবেশী থেকে শুরু করে দূরদ্বীপের মানুষরা জীবনকে কত ভাবেই না উপভোগ করছে। তার বয়সী কত ছেলে মেয়ে সাফল্যের পর্বতে পতাকা উড়িয়ে দিয়েছে। অথচ জীবনে সে উপভোগ করতে পারছে না। সাফল্যের কত সিঁড়ি ডিঙানো তার বাকি। এই অপ্রাপ্তিগুলো তাদের বিষণ্ণতার দিকে তাড়িয়ে নিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সেই বিষণ্ণতা ভুলে থাকতে যেয়ে, জীবনের অপ্রাপ্তির বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে যেয়ে তারা অন্তজালের রকমারীর ভিডিও গেমসের প্রতিও আসক্ত হয়ে পড়ে। শুধু যে ছেলে-মেয়েরা আসক্ত হচ্ছে তা নয়।

বুড়োরাও হচ্ছে। এ সময় সেই প্রতিশোধ নেবার খেলাও তাদের ক্লান্ত করে তুলে।তারা মুক্তি চায় সেই ক্লান্তি থেকে। জীবনের সেই পরাজয় থেকে। এই মুহূর্তটিতে তাদের আবার ফাঁদে ফেলে দেয় ‘ব্লু হোয়েল’র মতো নীল খেলাগুলো। যদ্দূর জানতে পেরেছি ৫০টির মতো ধাপ পেরোনোর পর বলা হয় আত্মহত্যা করতে। আসলে একে খেলা বলা যাবে কি না জানি না। কারণ কেউ একজন এই ধাপগুলো পরিচালনা করে, খেলোয়াড়কে মৃত্যুর সীমানায় গিয়ে দাঁড় করায়। যেখান থেকে তার আর ফেরার উপায় থাকে না। মৃত্যুই তার কাছে মুক্তির সহজপথ মনে হয় তখন।’ব্লু হোয়েল’ খেলায় মেতে বাংলাদেশে কারো মৃত্যু হয়েছে কি না, তা্ এখনো প্রমানিত সত্য নয়। কয়জন হাতে নীল তিমি একেঁছেন তারও প্রমাণ নিয়ে ধোঁয়াশা আছে। তবে ভারত, রাশিয়াসহ দুনিয়ার নানা জায়গায় অনেক কিশোর-কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে এমন মরণখেলা খেলে। এমন তথ্য উপাত্ত ওই নীল অন্তর্জালেই পাওয়া যাচ্ছে। তবে যা সত্য, সেটি হচ্ছে-আমরা তো অনেক আগেই ফেসবুকের নীল দরিয়ায় ডুবে আছি। ফেসবুকীয় সম্পর্কগুলো কত মৃত্যুর কারণ হয়েছে আমাদের জানা। ফেসবুক লাইভে এসে আত্মহত্যা করেছে এমন কয়েকটি ঘটনার কথা আমরা জানি। সাইবার ক্রাইম কত অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ হয়ে আছে, তাও আমাদের অজানা নেই। তাই এক ‘ব্লু হোয়েল’ গেম কেন আমাদের নতুন আতঙ্ক হবে? নীলদরিয়ায় পুরান ভাসানে কি আমরা সর্বনাশের সীমায় পৌঁছিনি? কোন খেলা সেই মরণ ভাসান থেকে আমাদের উদ্ধার করতে পারবে না। বিচ্ছিন্নতা আইল ভেঙ্গে আমাদের রৌদ্রোজ্জ্বল তেপান্তরের মাঠে পৌঁছাতে হবেই।নীল রং থাকুক প্রিয় বিষণ্ণ কোনো মুখের জন্য নয়। থাকুক নীল কোনো অপরাজেয় বা অপরাজিতার জন্য ।

লেখক : তুষার আবদুল্লাহ, বার্তা প্রধান, সময় টিভি

ad
ad

ফেসবুক থেকে সর্বশেষ

ad
ad

ফেসবুক থেকে সর্বাধিক পঠিত

আগের সংবাদ
পরের সংবাদ