সমালোচনা নাকি আত্মসমালোচনা!

শাহনাজ শারমিন: মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। এ কথা আমরা সবাই জানি। আমরা সমালোচনায় অত্যন্ত পারদর্শী। আমরা মানুষ যেন দিন দিন কেমন হয়ে যাচ্ছি। কেমন মানে হলো কেউ কারো ভালো চায় না, সর্বদা সমালোচনা করা, ভালো কি করলো তা দেখি না, খারাপটা নিয়েই পড়ে থাকা। না আপনার কথা বলছি না। যারা এমন কাজের অধিকারী তাদের কথা বলছি।

আরে আপা দেখলেন দেখলেন মেয়েটা কেমন করে হেঁটে গেলো! …… আরে ভাবি ওই ভাবিটা শাড়ি এমন করে পড়ল কেনো, এত্তো বাজে দেখাচ্ছে ছি! … এমন করে কি কেউ শাড়ি পড়ে?

“জানেন ভাবী, পাশের ফ্লাটের রুমকিকে নাকি আজ দেখতে এসেছিল। ছেলে সরকারি জব করে। বিয়ের কথা নাকি ফাইনাল। আমি বুঝি না ভাবি, কি দেখে ওই মেয়েকে পছন্দ করলো। দেখতে তো একদমই ভালো না। খাটো, মোটা, গালে ব্রণের দাগ।” এই কথাগুলো যিনি বললেন, তিনিই কিন্তু দেখতে অতো আহামরি কিছুই না। তবুও অন্যের সমালোচনা করলেন।

এই গেলো ঘরোয়ামুখী কথাবার্তা…. এবার আসি অফিশিয়াল কথাবার্তায়….. স্যার জানেন ওরা আসলে কাজই জানে না, কিভাবে যে আপনার অফিস চলবে আমি তাই বুঝি না…. এই ধরনের কথা একমাত্র তারাই বলেন যারা নিজেকে বড় করতে নিজের সুবিধাটাকে টিকিয়ে রাখতে এই রকম পরিবেশ তৈরী করে এবং দিন দিন কোম্পানি কে সর্বশান্ত করে দেন।

যে কারণে কোনও বিষয়ের সমালোচনা আমরা করে থাকি, সেই কারণের নিরসনের পথ খুঁজতে বলা হলে আমরা অনেকেই একটু দমে যাই।

কেউ যখন নিরসনের পথটাও খুঁজে দেন এবং বুঝিয়ে দেন নিরসনের প্রক্রিয়াটিকে সফল ভাবে রূপায়িত করতে হলে আমাদের প্রত্যেককে কী কী দায়িত্ব বা কর্তব্য পালন করতে হবে, তখন আমরা আরও পিছু হটে যাই।

সব জায়গাতেই কিছু সবজান্তার সবশেষ লোক থাকে … যেমন অর্ডার দিতে থাকেন কিন্তু নিজের অর্জনে কিছুই নেই। তারা চেষ্টা করেন কিভাবে নিজে বড় হয়ে অন্যদের ছোট করা যায়। এই ধরনের লোকজন আসলে যে যেভাবেই হোক না কেন নিজেরাই যে নিজেদের ছোট করছেন তারা এটাই সময়মত বোঝেন না।

আর তাই বলতে খারাপ লাগলেও, আজকাল এ ধরণের মন্তব্য করা মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কে,কি করলো? কার কি দোষ আছে? তা যাচাই বাছাই করা ইত্যাদি। আজকাল অনেক মানুষই আছেন যারা কারণে-অকারণে অন্যের দূর্বল দিকগুলো জনসমুক্ষে প্রকাশ করে খুব মজা পেয়ে থাকেন। কিন্তু নিজের সমালোচনা কয়জন-ই বা করেন ?

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একবার নিজের বিবেককে প্রশ্ন করে দেখুন তো? অন্যকে নিয়ে যে সমালোচনা করছেন, আসলেই কি তা ঠিক হচ্ছে!!!

বিবেক ঠিকই সঠিক উত্তর টাই দিবে। কারণ বিবেক সবসময় সঠিক দিক নির্দেশনা দিয়ে থাকে।

আমরা যে অন্যের সমালোচনায় মত্ত থাকি, আমরা নিজের সম্পর্কেই কতটা জানি?

নিজেকে আগে এই প্রশ্নগুলো করে দেখুন- ব্যক্তি হিসেবে আমি কতোটা পারফেক্ট? আমাদের কি কি দোষ ত্রুটি রয়েছে? তাহলেই দেখবেন একে একে নিজের খুঁত বা দূর্বলতা বের হয়ে আসছে এবং খুঁজে বের করাও কিন্তু খুব একটা কঠিন কাজ নয়। তাহলে নিজের ইম্পারফেকশনগুলো খুঁজে নিয়ে তা সমাধান করতে আমাদের খুব একটা কষ্ট হবে না।

নিজের দোষগুলো খুজে বের করে তা সমাধানের দিকে নিয়ে আসা একটু কঠিন হলেও অসম্ভব তো আর না! কেননা, আমরা নিত্য নৈমিত্তিক অন্যের যে দোষ ত্রুটি দেখে/শুনে থাকি, সেগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখাই হচ্ছে নিজের সমালোচনা করার প্রথম ধাপ।

অন্যের সমালোচনা প্রকাশ্যে অন্যদের কাছে বলে না বেরানোর থেকে মনে মনে নিজের বিবেকের সাথে প্রশ্ন করলেই চলবে। এতে বিবেক যেদিকে রায় দিবে না, সেদিকে না চললেই হবে। আর এটাই হচ্ছে আত্মসমালোচনা, যা নিজেরই সমালোচনার ফলাফল।

ভালো একজন মানুষ হতে হলে অবশ্যই নিজেকে আগে জানতে হবে। আর যে নিজের সমালোচনা করতে পারে, সেই তো আসল বুদ্ধিমান। কারণ সে তার নিজেকে জানে, তার দোষ ত্রুটির খবর রাখে। অন্যকে জানার আগে নিজেকে জানা কি গুরুত্বপূর্ণ না?? অবশ্যই।

অন্যের সমালোচনা করে আপনি পার পেয়ে যাবেন এটা ভুল ধারণা! একটা না একটা সময় আপনার চাদরে মোড়া খারাপ দিকগুলো অন্যের সামনে প্রকাশ হবেই। তখন আর লজ্জার শেষ থাকবে না। তাই নিজেকে ভালোভাবে তৈরি করে, তারপর অন্যকে বিচার করতে যাওয়াই ভালো। অন্যের কিছু দিক খারাপ লাগতেই পারে। সেক্ষেত্রে, সেটা সরাসরি তাকে বলাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

জনগোষ্ঠীর চরিত্র যেমন হবে, জাতীয় চরিত্রেও তার ছাপ পড়বে, এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। আসলে একজন মানুষকে চিন্তা করতে হবে আমি খেয়ে বাঁচতে পারলে আমার আর কাউকে পরোয়া করার প্রয়োজন নাই। সবাইকে ম্যানেজ করে চলতে হলে নিজের সাথে নিজেকেই ট্রিকস করে চলতে হবে।

সবার আগে নিজেকে জানতে এবং চিনতে হবে। এরপর বাইরের দুনিয়াকে জানার পালা। অন্যের সমালোচনা করা থেকে নিজেকে বিরত রাখলে সমাজও সুন্দর করা সম্ভব হবে। আর মনে রাখবেন রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন।

ad
ad

আরও সর্বশেষ

ad
ad

আরও সর্বাধিক পঠিত

আগের সংবাদ
পরের সংবাদ