রসিকতা করা ইসলামে কতটুকু সমর্থনযোগ্য

Loading...

ইসলাম স্বভাবজাত ধর্ম। শরীয়ত সমর্থিত বিনোদন করা বৈধ। রসিকতা, কৌতুক ও খোশগল্প চিত্ত বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। রসিকতার বৈধতার প্রমাণ মেলে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনে।
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে, সাহাবায়েকেরাম ও পরিবার-পরিজনের সঙ্গে কৌতুক, রসিকতা ও খোশগল্প করেছেন। রসিকতার প্রসঙ্গে হাদিসের অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে।

তবে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতিটি রসিকতার দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যাবে তাতে মিথ্যার লেশমাত্র নেই। শুধু মানসিক প্রশান্তি ও চিত্তবিনোদন এবং প্রশংসা করার জন্যই তিনি সবার সঙ্গে রসিকতা করেছেন, যা এ উম্মতের জন্য উত্তম শিক্ষা।

একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণের সাথে বসে খেজুর খাচ্ছিলেন। ওই মজলিসে হযরত আলী রা.ও ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং কয়েকজন সাহাবী খেজুর খেয়ে বীচিগুলো হযরত আলী রা.এর সামনে রেখে দিচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রসিকতা করে বললেন, বীচি দেখে অনুমান করা যায় কে বেশি খেজুর খেয়েছে। একথা শুনে আলী রা. উত্তর দিলেন, এতে অবশ্য দর্শক একথাও বুঝতে পারে যে, কোন মানুষটি বীচিগুলো বাদ দিয়ে শুধু খেজুর খেয়েছে আর কে বীচিসহ খেজুর খেয়ে ফেলেছে।
আনাস রা. থেকে বর্ণিত এক হাদিসে আছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার তাকে এ বলে সম্বোধন করেছিলেন: ‘হে দুই কান বিশিষ্ট ব্যক্তি’ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী আবু উসামা বলেন: অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথে রসিকতা করছিলেন। [তিরমিজিঃ ৩৫] এতে কৌতুকও হল এবং সে এতে মনে কষ্টও পেল না আর বাস্তবতাকে অস্বীকারও করা হল না। কারণ সে তো দুই কান ওয়ালা এমনিতেই আছে।
নাম তার আব্দুর রহমান। আসহাবে সুফফাদের অন্যতম। রাসূলের সার্বক্ষণিক সাথী। খেয়ে না খেয়ে রাসূলের আনুগত্য ও অহির জ্ঞানলাভে সারাক্ষণ রাসূলের বাড়িতেই পড়ে থাকেন। তিনিই রাসূলের মহববতের আবু হোরায়রা বা বিড়ালের বাবা। আব্দুর রহমান বিড়াল বাচ্চা কোলে নিয়ে রাসূলের কাছে যেতেন। একদিন তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে রসিকতা করে বললেন, হে আবু হোরায়রা। সেখান থেকেই আব্দুর রহমান হয়ে গেলেন আবু হোরায়রা। আবু হোরায়রা সর্বোচ্চ সংখ্যক হাদিস বর্ণনাকারী।

হযরত আবুহুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, সাহাবায়ে কেরাম নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি আমাদের সঙ্গে কৌতুক করেন! তিনি বলেন, হ্যাঁ তবে আমি মিথ্যা কিছু বলি না।
হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, যাহের ইবনে হারাম নামে একজন গ্রাম্য লোক ছিল। সে গ্রাম থেকে আসার সময় নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য গ্রামীণ হাদিয়া নিয়ে আসত, আর সে মদিনা থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় তিনি তাকে শহুরে হাদিয়া দিয়ে দিতেন। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার কৌতুক করে বলেন, যাহের আমাদের গ্রাম আর আমরা তার শহর। তিনি তাকে অত্যন্ত মহব্বত করতেন। সে দেখতে ছিল খুব কুৎসিত। একদা কোনো স্থানে দাঁড়িয়ে সে পণ্য বিক্রি করছিল। ইত্যবসরে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে বগলের নিচ দিয়ে তাকে এমন ভাবে ধরলেন যে, সে তাকে দেখতে পারছিল না। সে বলে উঠল কে রে! ছেড়ে দে। কিন্তু কোনোভাবে নবীজীকে একটু চিনতে পেরে ভালোভাবে তার বুকের সঙ্গে আপন পৃষ্ঠকে ঘষতে থাকল। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কে এই গোলামকে খরিদ করবে? যাহের বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাকে তো নিতান্তই কম মূল্যে বিক্রি করতে হবে। তিনি বললেন, আল্লাহর নিকট তোমার মূল্য অনেক।

শিশুদের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাস্য-রসিকতা করেছেন। আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে প্রিয় ছিল আমার এক ভাই, তার নাম আবু উমায়ের। আমার মনে আছে, সে যখন এমন শিশু যে মায়ের বুকের দুধ ছেড়েছে মাত্র। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে আসতেন এবং বলতেন, ‘হে আবু উমায়ের! কি করেছে তোমার নুগায়ের?’ নুগায়ের হল এমন একটি ছোট পাখি যার সাথে আবু উমায়ের খেলা করত। নুগায়ের মারা গিয়েছিল। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নুগায়েরের জন্য চিন্তিত দেখলেন এবং তার সাথে খেলা করলেন। [সহীহ বুখারি ৬২০৩]

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দৌহিত্র হযরত হুসাইন রা. উটে চড়ার বায়না ধরলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি দাঁড়াও, আমি তোমার উট হবো। একথা বলে তিনি মাটিতে উপুড় হয়ে হুসাইনকে স্বীয় পিঠে বসিয়ে ঘরের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় হামাগুড়ি দিতে লাগলেন। তখন হুসাইন রা. বললেন, উটের তো লাগাম থাকে, কিন্তু এই উটের লাগাম কই? তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুসাইনের হাতে নিজের দীর্ঘ চুল ধরিয়ে দিলেন এবং বললেন, এই যে তোমার উটের লাগাম। এমন সময় হযরত উমর রা. সেখানে এসে উপস্থিত হলেন এবং হযরত হুসাইন রা. কে লক্ষ করে বললেন, খুব ভাল একটা বাহন পেয়েছ তুমি। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বাহনে সওয়ার মানুষটিও কম ভাল নয়।

স্ত্রীদের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাস্য-রসিকতা করেছেন। আয়েশা রা. এর হাদীসে এসেছে: কোন এক সফরে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে ছিলেন। আয়েশা রা. বলেন : আমি রাসূলের সাথে দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রবৃত্ত হলাম এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পিছনে ফেলে দিলাম। অত:পর যখন আমার শরীর মোটা হয় গেল আবার প্রতিযোগিতা করলাম তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিজয়ী হলেন। তখন বললেন: এই বিজয় ঐ বিজয়র পরিবর্তে (শোধ)। [আবু দাউদঃ২২১৪]

Loading...

বৃদ্ধার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রসিকতা। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কাবার এক আনছারী বৃদ্ধা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এলেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কাছে দু‘আ করেন তিনি যেন আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করান। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘জান্নাতে তো কোনো বৃদ্ধ মানুষ প্রবেশ করবে না।’ এ কথা শুনে বৃদ্ধা বড় কষ্ট পেলেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আল্লাহ যখন তাদের (বৃদ্ধদের) জান্নাতে দাখিল করাবেন, তিনি তাদের কুমারীতে রূপান্তরিত করে দেবেন।’ [তাবরানী, আল-মু‘জামুল ওয়াছিত : ৫৫৪৫]

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, আনাস রা. থেকে বর্ণিতঃ কোন এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট একটি (ভারবাহী জন্তু) বাহন চাইলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন আমি তোমাকে একটি উটের বাচ্চার উপর চড়িয়ে দেব। সে বলল: হে আল্লাহর রাসূল! আমি উটের বাচ্চা দিয়ে কি করব? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: উটতো উটের বাচ্চা ছাড়া আর কিছু জন্ম দেয় না। [বুখারি: ১৯১৪]

তবে মনে রাখতে হবে রসিকতা সব সময় নয়। রসিকতা করার ব্যাপারে মানুষের ‘স্থান-কাল-পাত্র’ এ তিনটি দিক বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখা জরুরি। কেননা সব রসিকতা সবার সঙ্গে যায় না। আবার রস গ্রহণের যোগ্যতা সবার সমান থাকে না। কেউ খোশগল্প বা রসিকতাকে সানন্দে গ্রহণ করলেও অন্যজন আবার অসময়ে হওয়ার কারণে তাতে ক্ষেপে যায়। তাই রসিকতা করার সময় অবশ্যই স্থান-কাল-পাত্র হিসেব করেই করতে হবে।
মহান আল্লাহ আমাদেরকে শরিয়ত সমর্থিত চিত্ত বিনোদন ও সত্য ও সুন্দরের পক্ষে উত্তম সমাজ বিনির্মাণে কাজ করার তাওফিক দান করুন। আমিন

ভিডিওটি দেখতে নিচে ক্লিক করুন

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*