রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিলো সৌদি পত্রিকা!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মিয়ানমারের রাখাইনে চলছে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নির্মম নির্যাতন। তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ বিশ্বের তাবৎ মুসলিম দেশগুলো মিয়ানমারের নিন্দায় মেতে উঠেছে। সাহায্য, সহযোগিতা সহমর্মিতা দেখাচ্ছে রোহিঙ্গাদের প্রতি। তবে এ বিষয়ে নীরবতা পালন করছেন মুসলিম বিশ্বের অন্যতম দেশ সৌদি আরব। সৌদি বাদশা এমনকি রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিকে এ বিষয়ে সোচ্চার হতে দেখা যায়নি। উল্টো সৌদি বিভিন্ন গণমাধ্যমের দিকে তাকলে বোঝা যায় গণহত্যার শিকার রোহিঙ্গা নয় মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির পাশে সৌদি।

সৌদি আরবের দৈনিক পত্রিকা আল-শার্ক, আল-আওসাত রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর মিয়ানমারে যে গণহত্যা, নির্বিচারে ধর্ষণ ও বাড়ি ঘরে অগ্নিসংযোগ চলছে, তার জন্যে নিন্দা না জানিয়ে বরং দেশটির স্টেট কাউন্সিলর অং সাং সুচিকে সমর্থন করেছেন। এ দুটি পত্রিকার নিবন্ধে বলা হয়েছে, সুচি বারবার যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। সুচি বলেছেন, তার সরকার রাখাইনে সবাইকে রক্ষায় সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন।

সৌদি আরবের এ দুটি পত্রিকায় রোহিঙ্গা মুসলমানদের ‘সন্ত্রাসী’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ দুটি পত্রিকা লন্ডন, বৈরুত ও রিয়াদ থেকে প্রকাশিত হয়। সু চিকে সমর্থন জানিয়ে পত্রিকা দুটি বলে মিয়ানমারের এই নেত্রী তার দেশে সন্ত্রাস দমনে যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। মিয়ানমার সরকারের প্রতিও সমর্থন জানায় পত্রিকা দুটি।

পত্রিকা দুটির নিবন্ধে আরো বলা হয়, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমরা যে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে তারা সন্ত্রাসী।

ইতোমধ্যে ভারতের দিল্লির ঐতিহাসিক জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা সাইয়্যেদ আহমদ বুখারী মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নির্যাতন ইস্যুতে সৌদি আরবের নীরবতাকে ‘দুঃখজনক’ বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। সৌদি রাজা সালমান বিন আব্দুল আজিজকে দেয়া এক চিঠিতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মুসলিম দেশগুলোর জরুরি বৈঠক ডাকার আহ্বান জানিয়ে মাওলানা বুখারী বলেন, ‘বর্তমান সময়ে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমরা যে ধরণের বেদনাদায়ক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা আপনি অবগত হয়ে থাকবেন। সেখানে প্রকাশ্যে মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে। নিরাপত্তা বাহিনী ও সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে বর্বর অত্যাচার চালাচ্ছে। হাজারো রোহিঙ্গা মুসলিমদের হত্যা করা হয়েছে। কমপক্ষে এক লাখ মানুষ সেখান থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। এ অবস্থায় সেখানকার পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক ও বিভীষিকাময়। রোহিঙ্গা মুসলিমরা অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়েছেন। সেখানে আশ্রয় ও খাদ্য সামগ্রীর গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।’

মাওলানা বুখারী সৌদি রাজাকে ওই মানবিক সঙ্কটের প্রতি দৃষ্টি দিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়া রোহিঙ্গা মুসলিমদের রক্ষা করতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, সৌদি আরবের উদ্যোগে ৫৭টি মুসলিম দেশের ঐক্যবদ্ধ হলে এবং সৌদি আরব চাইলে রোহিঙ্গা মুসলিমদের সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান করতে পারে। এ ধরণের পদক্ষেপ নিলে তা বিশ্বের চোখে প্রশংসিত হবে এবং আল্লাহর কাছেও পুরস্কৃত হওয়ার কারণে পরিণত হবে বলে মাওলানা সাইয়্যেদ আহমদ বুখারী মন্তব্য করেছেন।

তবে তাতেও টনক নড়েনি সৌদি বাদশার। কোনো বিবৃতিও দেয়নি সৌদি রাজ পরিবার। তুরস্কে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ওয়ালেদ আল-খারেজী দেশটির দৈনিক সাবাহকে বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে সৌদি আরব নিষ্ক্রিয় রয়েছে একথা সঠিক নয়। সৌদি আরব সব সময় রোহিঙ্গাদের পাশে ছিল ও আগামীতে থাকবে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা যাতে দেশে ও বিদেশে নিরাপদে থাকেন এবং তাদের মানবাধিকার যাতে বজায় থাকে তার জন্য সৌদি বাদশাহ’র বিশেষ নজর রয়েছে।

তার মতে, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় সৌদি আরব যতটা সম্ভব কাজ করে যাবে। রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে সৌদি আরব কথায় না কাজে বিশ্বাসী। অনেকে সৌদি আরবের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এটা সঠিক নয়। রোহিঙ্গাদের জন্য সৌদি আরব গত ৭০ বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছে।

সৌদি আরবের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের ‘উগ্র বিচ্ছিন্নতাবাদী’ সমর্থন দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরেও জঙ্গি হামলায় মিয়ানমারের ৯ জন সীমান্ত রক্ষী মারা যায়। এরপর রাখাইন অঞ্চলে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। ঘরবাড়িতে আগুন দিয়ে বেশ কিছু রোহিঙ্গা গ্রাম পুড়িয়ে দেয়ার পর অসংখ্য নারীদের ধর্ষণ করে মগ যুবক ও সেনা সদস্যরা।

পরবর্তীতে রাখাইনে জঙ্গি সমস্যা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ব্রাসেলস-ভিত্তিক দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের (আইসিজি)। যাতে দাবি করা হয়েছিল মিয়ানমারে বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার পেছনে মদদ দিচ্ছে সৌদি আরব ও পাকিস্তান।

ওই সময় হারাকাহ আল-ইয়াকিন (বর্তমানে ওই সংগঠনের নাম রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি) নামের একটি গ্রুপ ভিডিও বার্তায় মিয়ানমারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার দায় স্বীকার করেছিল। এরপর আইসিজি রাখাইন রাজ্যে এই গ্রুপের চারজনের সঙ্গে এবং মিয়ানমারের বাইরে দুজনের সঙ্গে কথা বলে। আইসিজি দাবি করেছিল, হারাকাহ আল-ইয়াকিন গোপনে রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন গ্রামে দুই বছরের বেশি সময় ধরে গোপনে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে।

হারাকাহ আল-ইয়াকিনের নেতা আতাউল্লাহ, যাকে গ্রুপটির নয়টি ভিডিওতে দেখা গেছে। তার জন্ম করাচিতে। তিনি এখন সৌদি আরবের মক্কায় আছেন। তার বাবাও অভিবাসী রোহিঙ্গা মুসলিম। আতাউল্লাহ পাকিস্তান বা অন্য কোথাও গিয়ে আধুনিক গেরিলাযুদ্ধের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বলেও জানায় আইসিজি।

গ্রুপটির জ্যেষ্ঠ ২০ সদস্যের একটি কমিটি দেশের বাইরে থেকে গ্রুপের কর্মকাণ্ড তদারকি করে থাকে। গ্রুপটির সদর দপ্তর মক্কায় বলে জানায় আইসিজি।

সম্প্রতি মিয়ানমারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার পর আবারো রোহিঙ্গ দমন শুরু করেছেন মিয়ানমার। বৌদ্ধ অধ্যুষিত মিয়ানমার সরকার প্রধান ও শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সাং সুচি তার দেশের সীমান্ত রক্ষী হত্যার জন্যে ‘রোহিঙ্গা জঙ্গি’দের দাবি করে আসছে। এছাড়া সীমান্ত রক্ষী হত্যাকারীদের ‘বাঙালি সন্ত্রাসী’ বলে উল্লেখ করেছে মিয়ানমার সরকার।

ad
ad

আন্তর্জাতিক সর্বশেষ

ad
ad

আন্তর্জাতিক সর্বাধিক পঠিত

আগের সংবাদ
পরের সংবাদ