ও প্রজাপতি পাখা মেলো

শাহনাজ শারমিন: প্রজাপতিটা যখন তখন উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে রাঙা মেঘের মতন … বসে আমার আকাশ জুড়ে যখন তখন … মাছরাঙাটা ভাঙালো ঘুম পদ্মপাতার … তাই একতারাটা সুরের ঢেউয়ে কাটলো সাঁতার, আর প্রজাপতিটা রাঙালো পাখা জোছনা মাখা মেঘের মতন যখন তখন … মনে পড়ে কি এই গানের কথা!

প্রজাপতি শব্দটা শুনলেই মন ভালো হয়ে যায়। কেমন এক পূত-পবিত্র ভাব ফুটে উঠে। রঙে আর বৈচিত্রে প্রজাপতির তুলনা প্রজাপতি নিজেই। প্রকৃতিতে এর চেয়ে সুন্দর আর কি হতে পারে? এই মুহূর্তে তো আমার মনে পড়ছে না।

মনে পড়ে ছোটবেলায় প্রজাপতির পেছন পেছন কত দৌড়িয়েছি। আর এখন এই ঢাকা শহরে প্রজাপতির দেখা পাওয়া যেন হ্যালির ধূমকেতু দেখতে পাওয়ার মতোই দুর্লভ। ফুল ছাড়া প্রজাপতি কিভাবে? ওহু, একদম না।

ছয় ঋতুর দেশ বাংলাদেশে দেখা মিলে প্রায় ৫০০ থেকে ৫৫০ জাতের প্রজাপতির, এর মধ্যে পরিচিত জাতের সংখ্যা ৪৩০টি। ছোট বড় রঙিন কিংবা কালো, মোটামুটি সব ধরণের প্রজাপতি আছে আমাদের দেশে। কিন্তু শুধু কালচে রঙের এক জাতের প্রজাপতিই মানুষের বাড়িতে ঢোকার সাহস করে।

‘প্রজাপতি, প্রজাপতি, কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা? ওই লাল-নীল ঝিলিমিলি আঁকাবাঁকা।’ ছোটবেলার গানটার কথা মনে আছে?

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যস্ততা বাড়ে। আর সেইসঙ্গে আমরাও ছোটবেলার স্মৃতিগুলো ফেলে মানিয়ে নেই কর্মব্যস্ত জীবনের সঙ্গে। এই কর্মব্যস্ত জীবনের ফাঁকে হুট করেই যদি একবার এই গানটার কথা মনে পড়ে যায়, তাহলে তো মাথায় একটা প্রশ্ন আসতেই পারে- সত্যিই তো, এমন রঙিন পাখা কোথায় পেল প্রজাপতি?

প্রজাপতির রঙিন পাখার মূল রহস্য হচ্ছে পিগমেন্টেশন। সাধারণভাবে যেকোনো কিছুর রঙের পেছনেই রয়েছে পিগমেন্টেশনের ভূমিকা। গাছের পাতা সবুজ হয় কেননা পাতায় রয়েছে ক্লোরোফিল পিগমেন্ট। ক্লোরোফিল সবুজ ছাড়া সমস্ত রঙের তরঙ্গদৈর্ঘ্য শুষে নেয়, ফলে আমরা গাছের পাতা সবুজ দেখি।

একইভাবে বিভিন্ন পিগমেন্টের উপস্থিতি থাকায় প্রজাপতির পাখা রঙিন হয়। মূলত প্রজাপতির পাখায় থাকে মেলানিন পিগমেন্ট। এর উপস্থিতিতে প্রজাপতির পাখার রং হলুদ, বাদামি ও কালো হয়ে থাকে।

একটা মজার তথ্য হচ্ছে প্রজাপতির পাখার রং কিন্তু পরিবর্তন হয়। বিভিন্ন দিক থেকে দেখলে তাদের পাখা বিভিন্ন রঙের দেখায়। আর এটাই অন্য প্রাণীর সঙ্গে তাদের রঙিন পাখার সবচেয়ে বড় পার্থক্য।

প্রজাপতির পাখার এই রং পাল্টানোর রহস্য হচ্ছে ইরিডিসেন্স বা চিত্রাভা। যখন আলো অনেকগুলো স্তরের একটি স্বচ্ছ পৃষ্ঠতলের ভেতর দিয়ে যায়, তখন প্রতিটা পৃষ্ঠ থেকে আলাদা আলাদাভাবে আলোর প্রতিফলন ঘটে। ফলে বিভিন্ন রং তৈরি হয়। আপনি জায়গা পরিবর্তন করলে তখন ভিন্ন ভিন্ন রং দেখবেন।

প্রজাপতির পাখার ক্ষেত্রে ঠিক এই ঘটনাটাই ঘটে। প্রজাপতির পাখায় স্বচ্ছ পর্দার ওপরে থাকে আঁশের একটি আস্তরণ। এই আঁশগুলো প্রজাপতির পাখার স্বচ্ছ পর্দাকে ঢেকে রাখে। এগুলোকে খালি চোখে ধূলোর মতো দেখায়। এগুলো এতই কোমল ও সূক্ষ্ম যে হাত দিয়ে স্পর্শ করলে এগুলো হাতের সঙ্গে লেগে আসে। প্রজাপতির পাখার গঠন এমন হওয়ায় খুব সহজেই এখানে ইরিডিসেন্স প্রক্রিয়া ঘটে। ফলে বিভিন্ন দিক থেকে দেখলে প্রজাপতির পাখার বিভিন্ন রং দেখা যায়।

এটাই হচ্ছে প্রজাপতির রঙিন পাখার রহস্য। কিন্তু প্রজাপতির রঙিন পাখা কি শুধুই তাদের সৌন্দর্য বাড়ায়, নাকি অন্য কোনো কাজেও লাগে?

আসলে প্রজাপতির পাখা তার নিজের প্রয়োজনেই রঙিন। ছদ্মবেশ ধারণ করে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা পেতে প্রজাপতির রঙিন পাখার কোনো বিকল্প নেই। এ ছাড়া এদের পাখার রং ও নকশা দেখেই পুরুষ ও মেয়ে প্রজাপতি আলাদা করা হয়।

ad
ad

ফিচার সর্বশেষ

ad
ad

ফিচার সর্বাধিক পঠিত

আগের সংবাদ
পরের সংবাদ