আগ্রহ বাড়ছে আর্টিকেল ৯৭ নিয়ে !

Loading...

আলোচনায় আর্টিকেল নাইন্টি সেভেন। এর সারকথা হলো, রাষ্ট্রপতির সন্তুষ্টিক্রমে প্রধান বিচারপতিকে স্বপদে বহাল রেখেই একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেয়া সম্ভব। আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ে ষোড়শ সংশোধনীর রায়কে ঘিরে চলমান বিতর্কের প্রেক্ষাপটে সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদের প্রয়োগের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। আবার দায়িত্বশীল সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, এ বিষয়ে সংসদে একটি বিল আনার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। সেমতে বিলের একটি খসড়া তৈরির প্রস্তুতির কথাও শোনা যাচ্ছে।
সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ বলেছে, ‘প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হইলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে প্রধান বিচারপতি তাঁহার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ বলিয়া রাষ্ট্রপতির নিকট সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে ক্ষেত্রমত অন্য কোনো ব্যক্তি অনুরূপ পদে যোগদান না করা পর্যন্ত কিংবা প্রধান বিচারপতি স্বীয় কার্যভার পুনরায় গ্রহণ না করা পর্যন্ত আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারকের মধ্যে যিনি কর্মে প্রবীণতম, তিনি অনুরূপ কার্যভার পালন করিবেন।’

উল্লেখ্য যে, এই অনুচ্ছেদটি বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনও কোনো বিতর্কে আসেনি। ১৯৭৫ সালে প্রধান বিচারপতি সায়েম প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন। ৫ নভেম্বরে তিনি বিদায় নেন। তখনও ৯৭ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ ঘটেনি। ১৯৮২ সালের এপ্রিলে প্রধান বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেনকে অপসারণের সময় বয়সসীমা কমানো হয়েছিল। সুতরাং ফৌজি শাসনামলেও ৯৭ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ ঘটেনি। তবে অনেকে দাবি করছেন, “অন্য কোনো কারণে”এবং “রাষ্ট্রপতির নিকট সন্তোষজনকভাবে’’ প্রতীয়মান হলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগের শর্ত পূরণ হয়। এরকম ব্যাখ্যা যারা দিচ্ছেন, তেমন কোনো আইনবিদ বা আইনজীবী এখনও কোনো প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়েছেন বলে জানা যায় না। তবে ড. শাহদীন মালিকসহ আইনবিদরা বলছেন, এখানে প্রেসিডেন্টকে খেয়ালখুশিমতো ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগের সুযোগ দেয়া হয়নি। এরকম ব্যাখ্যা দেয়া হলে তো আর বিচারবিভাগের স্বাধীনতাই থাকে না। এই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হলে রাষ্ট্রপতিকে অবজেকটিভ সেটিসফিকশনের শর্ত পূরণ করতে হবে। অন্যথায় রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ হবে।

এটা লক্ষণীয় যে, দু-সপ্তাহের বেশি সময় আগে খবরের কাগজে ৯৭ অনুচ্ছেদ প্রয়োগের বিষয়টি শিরোনামে এলেও সরকারি দল থেকে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে কেউ এখনও বিষয়টি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নাকচ করছেন না। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইন ও বিচারমন্ত্রী আনিসুল হক এবং অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবুল আলম যা বলেছেন তা বরং একটি ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে রেখেছে। যেমন অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, ‘আমাকে কেন এ বষিয়ে প্রশ্ন করছেন। এ বিষয়ে আইন মন্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করুন।’ আবার আইন ও বিচারমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, বাতাসে কত কি ভেসে বেড়াচ্ছে। আমরা প্রধান বিচারপতিকে বাধ্য করব না।

একটি দৈনিকে তাঁর এই বক্তব্য শীর্ষ কলামে ছাপা হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২১শে আগস্টের আলোচনা সভায় প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে কঠোরতম পর্যবেক্ষণ দেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায় প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের প্রসঙ্গও বাদ পড়েনি। অবশ্য বিশ্লেষকদের অনেকে সন্দেহ করছেন, প্রধান বিচারপতিকে যেহেতু আনুষ্ঠানিকভাবে অপসারণ করা দুরূহু, সেকারণে তাকে স্বপদে রেখেই ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগের বিকল্প অনেকের চিন্তায় এসে থাকতে পারে।

এটা লক্ষণীয় যে, আইনমন্ত্রী বা অ্যাটর্নি জেনারেল ৯৭ অনুচ্ছেদের প্রয়োগকে নাকচ করে দেননি। তারা এখনও পর্যন্ত বলেননি যে, ৯৭ অনুচ্ছেদের বিষয়ে কোনো চিন্তাভাবনা নেই। এসব যা বলাবলি বা জল্পনা-কল্পনা করা হচ্ছে তা নিতান্ত গুজব। অবশ্য বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এ বিষয়ে কিছু বক্তব্য রেখেছেন কিন্তু তাতেও এটা পরিষ্কার হয়নি যে, ৯৭ অনুচ্ছেদ প্রয়োগের আশংকা কাটেনি। কারণ তিনি বলেছেন, তার দল সামনে নির্বাচন রেখে কোনো জটিলতায় যেতে চান না। তার কথায় আমরা একটি স্বাভাবিক অবস্থায় থাকতে চাই। কিন্তু আইনমন্ত্রী যে উদ্যোগ নিয়েছেন, সেটা ঘটলে কোনো সমস্যা থাকে না।’ অনেকের মতে, তাঁর অবস্থান শর্তসাপেক্ষ। যদি না ঘটে তাহলে সমস্যা থেকে যায়। আর আইনমন্ত্রী এখনও পর্যন্ত স্পষ্ট করেননি যে, তিনি কি করবেন। তিনি সংবাদ সম্মেলনে যেদিন সরকারের অবস্থান লিখিতভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন, সেদিন তিনি রিভিউ এবং এক্সপাঞ্জ দুটিই বলেছিলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে এটা স্পষ্ট যে, সরকার সিদ্ধান্তহীনতা বা দোদুল্যমান অবস্থায় রয়েছে। বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের ব্যানারে আওয়ামী লীগ বর্তমান সরকার থেকে একটি আলাদা অবস্থান নিয়েছে। দল সমথর্ক আইনজীবীরা বলছেন, রিভিউ হবে কি হবে না সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। তারা চাইছেন প্রধান বিচারপতি যাতে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে সিদ্ধান্ত নেন। সেকারণে দেখা যাচ্ছে, তোফায়েল আহমেদও তার সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেছেন যে, তারা চাইছেন তাদের ভাষ্য মতে অপত্তিকর অংশগুলো বাদ দিতে। তিনি প্রচ্ছন্নভাবে প্রধান বিচারপতি স্বপদে থাকলে একটি অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়তে পারেন বলেও মনে করিয়ে দিয়েছেন। কারণ তিনি বলেন, অতীতে প্রধান বিচারপতি মুনিমের কোর্ট বয়কট করা হয়েছিল। আমরা আশা করব, তিনি সম্মানের সঙ্গে অবসর নেবেন। বাণিজ্যমন্ত্রীকে যখন নির্দিষ্টভাবে প্রশ্ন করা হয় যে, ৯৭ অনুচ্ছেদের কথা উঠেছে, সে বিষয়টা ঠিক কিনা? তখন তিনি কিন্তু প্রথমেই মন্তব্য করেন, “কেউ যদি এক্সট্রিম কিছু করতে চান বা কারো বিরুদ্ধে যদি তেমন কোনো বিষয়, যেটা ৯৭ অনুচ্ছেদে পরিষ্কার লেখা আছে।

আগামী দেড় মাস পরে কোর্টের স্বাভাবিক কার্যক্রম আবার শুরু হবে। আগামী ৩রা অক্টোবর আদালত আবার খুলবে। আগামী বছরের গোড়ায় অবসরে যাওয়ার আগে সরকারের জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর দুটি বিষয় আছে। একটি হলো মাসদার হোসেন মামলার আলোকে নিম্ন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলা সংক্রান্ত গেজেট করা, সরকার এখন পর্যন্ত দুই ডজন বার সময় নিয়েছে, অন্যদিকে আইন ও বিচার বিভাগের সচিবের বৈধতা সংক্রান্ত রিটের শুনানি। সুপ্রিম কোর্টকে না জানিয়ে আইন সচিবকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়। হাইকোর্ট বিভাগ তিন মাসের জন্য তার নিয়োগ স্থগিত করার দিনেই চেম্বার জজ তা দু-মাসের জন্য স্থগিত করেন।

Loading...

পর্যবেক্ষকরা একমত, ষোড়শ সংশোধনী বাতিল হওয়ার পরে সরকারের সবথেকে স্পর্শকাতরতা এই দুটি বিষয়ে।
অনেকেরই ধারণা জাতীয় সংসদের আসন্ন অধিবেশন বাহাত্তরের সংবিধানের ওই অনালোচিত অনুচ্ছেদটির একটি সংশোধনী বিল আসতে পারে। কারণ ওই সংশোধনীতে রাষ্ট্রপতির জন্য একটি সীমাবদ্ধতা আছে। সেটি হল তাঁকে আপিল বিভাগের প্রবীণতম বিচারককেই ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে। প্রধান বিচারপতির পরে আছেন বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহাব মিয়া। আপিল বিভাগে তিনি এই সরকারের আমলে নিয়োগ পেলেও তাঁর নিয়োগ অযথা কিছুটা বিলম্বিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে আপিল বিভাগের যে কাউকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করার বিধান আনা হতে পারে।

উল্লেখ্য, বর্তমানের রেওয়াজমতে প্রধান বিচারপতি নিজেই নিজের ছুটি মঞ্জুর করেন। এরপর ৯৭ অনুচ্ছেদমতে রাষ্ট্রপতি ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেন। এটা কার্যত প্রধান বিচারপতির পরামর্শেই এর অনুশীলন চলে আসছে।
সূত্রমতে বর্তমান প্রধান বিচারপতি তার আসন্ন বিদেশ সফরে কিছুটা পরিবর্তন এনেছেন। সেপ্টেম্বরে তাঁর নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠেয় বিশ্ব সিলেটি সম্মেলনে যোগদানের কথা ছিল। এটা তিনি বাতিল করেছেন। তিনি তাঁর মেয়ের কাছে কানাডায় ও পরে জাপানে অনুষ্ঠেয় প্রধান বিচারপতিদের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদানের কথা আছে।
ওয়াকিবহাল মহলের চোখ এখন তাই সংসদের আসন্ন অধিবেশনের দিকে। প্রধান বিচারপতির সাধারণ ছুটিতে যাওয়ার বিষয়টিও এখন অনেকের কাছে অসাধারণ বা তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ধরা দিচ্ছে।

বাংলাদেশের সাংবিধানিক আলোচনা ও বিতর্কে ৯৭ অনুচ্ছেদটি আকস্মিকভাবে আলোচনায় এসেছে। এটি একটি নবতর মাত্রা যুক্ত করেছে। ষোড়শ সংশোধনীর রায় বিশেষ করে প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণ প্রসঙ্গে নাটকীয়ভাবে নাইন্টি সেভেন গণমাধ্যমের শিরোনাম এবং বিভিন্ন মহলে এখন কৌতূহলী আলোচনার খোরাকে পরিণত হয়েছে।

ভিডিওটি দেখতে নিচে ক্লিক করুন

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*