রোহিঙ্গা ইস্যু
নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপ চায় ওআইসি ও বৃটেন

Loading...

মিয়ানমারে জাতিগত সহিংসতার শিকার রোহিঙ্গাদের রক্ষায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপ চায় ওআইসি ও বৃটেন। রোহিঙ্গা নির্যাতনের নিন্দা করে প্রচারিত বার্তা এবং জাতিসংঘ মহাসচিবকে লেখা চিঠিতে বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে এবং কার্যকরভাবে নিরাপত্তা পরিষদে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন মুসলিম বিশ্বের জোট ওআইসি মহাসচিব। আর বৃটেনের তরফে বলা হয়েছে, কথিত রোহিঙ্গা যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অভিযানে যেভাবে বেসামরিক লোক হতাহত হচ্ছেন, তাতে নিরাপত্তা পরিষদে ইস্যুটি নিয়ে আলোচনা জরুরি হয়ে পড়েছে। এদিকে গতকাল মিয়ানমারের কার্যকর নেতা অং সান সুচি বরাবর পাঠানো পৃথক চিঠিতে যে কোনো মূল্যে সহিংসতা বন্ধ এবং আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আমলে নিয়ে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন ওআইসি মহাসচিব ড. ইউসুফ আল ওতাইমিন। ওআইসির নিন্দা বার্তায় বলা হয়েছে, গত ২৫শে আগস্টের একটি হামলাকে কেন্দ্র করে রাখাইনে সামরিক অভিযানের নামে রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে নির্মূলে খুন, অগ্নিসংযোগসহ ধ্বংসযজ্ঞ চলছে। তাতে এ পর্যন্ত শতাধিক নিহত হয়েছে। প্রায় ২০ হাজার নারী, পুরুষ শিশু তাদের বসতভিটা ছেড়ে উদ্বাস্তু জীবনযাপন করছে। এটি যে কোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে। আন্তর্জাতিক অভিযান সংস্থা আইওএম জানিয়েছে, বাস্তুচ্যুত ওই মিয়ানমার নাগরিকদের প্রায় ১৮ হাজার এরইমধ্যে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছেন। জনবহুল বাংলাদেশে গত ৩ দশক ধরে প্রায় ৪ লাখ মিয়ানমার নাগরিককে বয়ে চলেছে, যারা বিভিন্ন সময়ে নির্যাতিত হয়ে প্রাণে বাঁচতে সীমান্ত পাড়ি দিয়েছে। এদের নিজ ভূমে ফেরত পাঠানো এবং নতুন করে মিয়ানমার নাগরিকদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ (পুশিং) ঠেকাতে এ সংকটের একটি স্থায়ী সমাধান চায় ঢাকা। এ নিয়ে বাংলাদেশের তরফে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক চেষ্টা রয়েছে। কিন্তু মিয়ানমারের তরফে কোনো উদ্যোগেই সাড়া নেই। তারা বরাবরই এটি এড়িয়ে চলেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা সংকটের মূলে গিয়ে, তাদের নাগরিকত্ব ও অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার যে সুপারিশ করেছে রাখাইন কমিশন তার দ্রুত এবং পূর্ণ বাস্তবায়নে মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়াতে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ। এ নিয়ে ইইউ, তুরস্ক, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা জাতিসংঘ অধিবেশনে আলোচনার যে উদ্যোগ নিচ্ছে তাতেও পূর্ণ সমর্থন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করে সহযোগিতা দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ঢাকা।
রোহিঙ্গা নিধনে ওআইসির উদ্বেগ, নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা: রোহিঙ্গাদের নির্মূলে রাখাইনে নতুন করে যে সহিংসতা শুরু হয়েছে এবং হাজার হাজার রোহিঙ্গা প্রাণে বাঁচতে প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হওয়ার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ওআইসি। মুসলিম বিশ্বের ওই জোট প্রচারিত নিন্দা বার্তায় বলা হয়েছে-মংডুতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কর্তৃক মানুষের বাড়িঘর ভাঙচুরের বিশ্বাসযোগ্য তথ্য তাদের কাছে আছে। সাধারণ মানুষের ওপর শক্তিশালী সামরিক অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহারসহ সেনাদের বৈষম্যমূলক নির্যাতনের নিন্দা জানায় ওআইসি, যাতে প্রায় ২০০০০ রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত ওই লোকজনকে তাদের বসতভিটায় ফেরানো দ্রুত ব্যবস্থা নিতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ওআইসি তরফে বলা হয়, সহিংসতার শিকার লোকজনকে সহায়তায় মানবিক ত্রাণ সংস্থাগুলোকে ওই এলাকায় প্রবেশের সুযোগ দিতে হবে। রাখাইনে যেসব ঘটনা ঘটছে তা রোহিঙ্গাদের মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন। তাছাড়া সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষায় মিয়ানমারের বৈশ্বিক যে অঙ্গীকার রয়েছে এটি তারও ভয়াবহ বিচ্যুতি। এমন সহিংসতার ঘটনা কেবল মাত্র উত্তেজনাকে তীব্রতর করবে এবং অস্থিরতাকে উসকে দিবে। মিয়ানমার সরকার এসব ঘটনার জন্য বিদ্রোহীদের দায়ী করেছে এবং রোহিঙ্গাদের ঘর বাড়িতে অগ্নিসংযোগের জন্য রোহিঙ্গাদেরই অভিযুক্ত করেছে। এ ধ্বংসযজ্ঞে নিরাপত্তা বাহিনী দায় অস্বীকার করেছে। ওআইসি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক আক্রমণকে কোনো অবস্থাতেই এড়িয়ে যাচ্ছে না বা ক্ষমা করেনি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অবশ্যই মিয়ানমার সরকারের উচিত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, মানবাধিকার প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো এবং মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। ওআইসি এরই মধ্যে কফি আনানের নেতৃত্বাধীন রাখাইন কশিমনের রিপোর্ট আমলে নিয়েছে উল্লেখ করে বার্তায় বলা হয়- আনান কমিশনের রিপোর্টে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে রাখাইনে যে কোনো মূল্যে সংঘাত-সহিংসতা ঠেকাতে সরকারকেই উদ্যোগী হতে হবে। সেখানে শান্তি বজায় রাখতে হবে এবং দীর্ঘ সময় ধরে অধিকার বঞ্চিত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের অন্য নাগরিকদের মতো উন্নয়নের মূল স্রোতে সম্পৃক্ত করতে হবে। রাখাইনের চলমান সংঘাত গোটা অঞ্চলকে অস্থিরতা করে তুলেছে উল্লেখ করে রিপোর্টে বলা হয়- যতদিন না রাখাইনের নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য বন্ধ হবে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে এবং রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ফেরত দেয়া হবে ততদিন এ সংকটের সমাধান হবে না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ওআইসি মহাসচিব বিষয়টি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপনের আহ্বান জানান। চলতি বছরের জানুয়ারিতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত বিশেষ বৈঠক এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সর্বসম্মতিতে গৃহীত রেজুলেশনের উল্লেখ করে তা মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যেসব সদস্য রাষ্ট্র রোহিঙ্গা নির্যাতনের নিন্দা ও উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন তার প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করা হয়।
জাতিসংঘ মহাসচিব ও সুচিকে ওআইসি মহাসচিবের চিঠি: এদিকে ওআইসি মহাসচিব ড. ইউসেফ আল ওতাইমিন জাতিসংঘ মহাসচিব এন্তনিয়ো গুতেরেজ এবং মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সুচিতে পৃথক চিঠিতে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। উভয় চিঠিতে তিনি পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে তাদের রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিষয়টি নিরাপত্তা পরিষদে নিতে জাতিসংঘ মহাসচিবকে এবং সাধারণ রোহিঙ্গাদের রক্ষায় সুচির হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
মিয়ানমারে সহিংসতা বন্ধে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক চায় বৃটেন: ওদিকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংসতার অবসানে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকের অনুরোধ জানিয়েছে বৃটেন। গতকাল আল-জাজিরা টেলিভিশনের অনলাইনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযানে বেসামরিক রোহিঙ্গাদের হতাহত হওয়ার খবরের পর বৃটেনের তরফে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকের অনুরোধ জানানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে- কথিত রোহিঙ্গা যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী অভিযানে গণহারে বেসামরিক লোকজন হতাহত করছে। এ নিয়ে আলোচনায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সভা আহ্বান করা জরুরি। জাতিসংঘে বৃটেনের রাষ্ট্রদূত ম্যাথু রাইক্রফট টুইটারে লিখেছেন, বার্মার (মিয়ানমার) পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক বসার অনুরোধ করা হয়েছে।
ইইউর উদ্যোগ: ব্রাসেলসের একটি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, ১২ই সেপ্টেম্বর থেকে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি আলোচ্য সূচিতে রাখতে যাচ্ছে ২৮ দেশের ইউরোপীয় জোট ইইউ। এ জন্য ৫ই সেপ্টেম্বর ইইউর রাজনীতি ও নিরাপত্তাবিষয়ক কমিটিতে রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হবে। মঙ্গলবার ইইউর পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে এই আশ্বাস দেয়া হয়েছে। মূলত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ইইউকে পররাষ্ট্র, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে পরামর্শ দেয় এই কমিটি।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জাতিসংঘ অধিবেশনে আলোচনার উদ্যোগ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার: ওদিকে রাখাইনে বেসামরিক লোকজনের সুরক্ষা নিশ্চিত করে সমস্যা সমাধানের জন্য মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়াতে আগামী মাসে নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে আলোচনার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে বিভিন্ন দেশ। তুরস্কসহ ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) বেশ কয়েকটি দেশ রোহিঙ্গাতে জাতিসংঘ অধিবেশনের আলোচ্যসূচিতে যুক্ত করতে চাইছে। দুই সপ্তাহ পর অধিবেশন শুরুর আগের সময়টাতে আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে রাখাইনে ‘নিরাপদ অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার জন্য মিয়ানমারকে আহ্বান জানাতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়। তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদোলু জানিয়েছে, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান রাখাইনের পরিস্থিতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আলোচ্যসূচিতে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন। রাখাইনে অস্থিরতায় সক্রিয় ভূমিকা না রাখায় তিনি আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের সমালোচনা করেন। এদিকে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মেরসুদি জাকার্তায় মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে মিয়ানমারের সব পক্ষকে অবিলম্বে রাখাইনে সহিংসতা বন্ধ, রাখাইনে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা এবং মুসলিম সমপ্রদায়সহ রাজ্যের সব মানুষকে মানবাধিকার সমুন্নত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। রাখাইনের পরিস্থিতিকে অত্যন্ত জটিল অবহিত করে তিনি বলেন, রাজ্যের শান্তি, নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নে সব পক্ষের সহযোগিতা জরুরি। আনান কমিশনের প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নসহ মিয়ানমারের সংহতি প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্র ও অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নে ইন্দোনেশিয়ার সমর্থন অব্যাহত থাকবে। এদিকে রাখাইনের পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানিয়ে মঙ্গলবার বিবৃতি দিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের নির্বিচারে বল প্রয়োগ করা থেকে বিরত রাখা নিশ্চিত রাখতে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার জেইদ রাদ আল-হুসেইন মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে গত শুক্রবার নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো রকম বৈষম্য ছাড়াই সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাজনৈতিক নেতাদের দায়িত্ব। রোহিঙ্গা পরিস্থিতিকে দুঃখজনক বলে এটা অনুমিত ছিল এবং তা এড়ানো যেত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ভিডিওটি দেখতে নিচে ক্লিক করুন

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*