Templates by BIGtheme NET
Home / slider /
বিশিষ্টজনের অভিমত

বিশিষ্টজনের অভিমত

Loading...

নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঢুকে পড়েছে সুযোগসন্ধানীরা। রাজপথে শুরু হয়েছে সহিংসতা। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দাবি মেনে কথা বলা হলেও রাজপথ ছাড়ছে না শিক্ষার্থীরা। কেন এ পরিস্থিতি? অন্যদিকে বাস মালিকরা নিরাপত্তার অজুহাত দিয়ে অঘোষিত ধর্মঘট পালন করছেন। তাদের এই পুরনো কৌশলে সারাদেশে যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল, চরম দুর্ভোগে জনজীবন। অঘোষিত ধর্মঘটের ব্যাপারে সরকারের অবস্থানও নির্বিকার। এর শেষ কোথায়- তা জানতে গতকাল রোববার সমকাল থেকে বিশিষ্টজনের সঙ্গে কথা বলা হয়। তাদের সবাই একবাক্যে বলেছেন- শিক্ষার্থীদের এখন শ্রেণিকক্ষে ফিরে যাওয়াই সঠিক কাজ। আর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মাধ্যমে উন্মোচিত হওয়া গণপরিবহনের ভয়াবহ নৈরাজ্য নিরসনে সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেই অবস্থান সুস্পষ্ট হওয়া উচিত। একই সঙ্গে ধর্মঘট নিয়ে সরকারকে বাস মালিকদের কঠোর জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে। গণপরিবহনে অরাজকতা বন্ধ করতেই হবে।

বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল কথা বলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয় ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, সেলিনা হোসেন, সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক এবং নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন। এ ছাড়া ঢাকার একাধিক নামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের মতামত জানাতে চাওয়া হয়। তারাও একই ধরনের মত দিয়ে বলেন, সড়কে চরম বিশৃঙ্খলায় নারী শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনায় পড়ছে। সেই বিশৃঙ্খলা দূর করতে না পারলে শিক্ষার্থীদের আস্থা ফেরানো যাবে না।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দীর্ঘায়িত হলে দুর্বৃত্তরা ঢুকে যেতে পারে। যার কিছু আলামতও দেখা যাচ্ছে। বেশিদিন এভাবে চললে এ আন্দোলনের প্রতি যে সহানুভূতি ছিল, তা বিরক্তিতে রূপ পেতে পারে। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফেরা উচিত। সরকারপ্রধান আশ্বাস দিয়েছেন- তিনি শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণে কাজ করছেন। এ আশ্বাসের প্রতি তাদের আস্থা রাখা উচিত। শিক্ষার্থীদের যা কিছু দেখিয়ে দেওয়ার, তা তারা দেখিয়েছে। এখন বাকি দায়িত্ব সরকারের। অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল ও উদ্বেগজনক হচ্ছে। প্রথমে যখন শিক্ষার্থীরা সহপাঠীর মর্মান্তিক মৃত্যু মেনে না নিয়ে নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজপথে নামল, তখন অনেক দিন পর শান্তির সুবাতাস পেয়েছিলাম। সরকারের দায়িত্বশীলদের প্রথমেই উচিত ছিল শিক্ষার্থীদের কাছে গিয়ে তাদের দাবিগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং তাদের বুঝিয়ে শ্রেণিকক্ষে ফেরানো। সরকার দাবি মেনে নেওয়ার কথা তিন-চার দিন পরে বলেছে। উন্মোচিত হওয়ায় গণপরিবহনের নৈরাজ্যের চিত্র অনুধাবন করে সরকারের উচিত তা নিরসনে সুস্পষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া। যারা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা করেছেন, তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। বাস মালিকরা কেন ধর্মঘট করে জনজীবনে দুর্ভোগ সৃষ্টি করছেন, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরি।

সেলিনা হোসেন বলেন, আমাদের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে একটি প্রতিরোধের জায়গা তৈরি করেছে। অন্যায় মেনে না নেওয়ার যে দৃঢ়তা তারা দেখিয়েছে, পুলিশকে গোলাপ ফুল দিয়ে তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের নতুন পথও জাতিকে দেখিয়েছে। এটা জাতিকে আশান্বিত করেছে। এর বিপরীতে শিক্ষার্থীদের স্কুল ইউনিফর্মের কলার চেপে ধরা, লাঠি হাতে তেড়ে যাওয়ার যে দৃশ্য দেখেছি- তা ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত করেছে। শিশুদের সঙ্গে এ ধরনের আচরণের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে বলে প্রত্যাশা করছি। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দীর্ঘায়িত হতে পারে না। তাদের প্রধান কাজ লেখাপড়া করা, বড় মানুষ হওয়া। এ কাজটিই এখন করতে হবে। কিন্তু সরকারকে গণপরিবহনের নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যেতে হবে। যারা রাস্তা যানবাহনশূন্য করে নতুন সংকট তৈরি করেছে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর হতে হবে। আমরা দেখেছি- কিছু যুবক হেলমেট পরে লাঠি হাতে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছে। তাদের পরিচয় কী, তাও সরকারকে জানাতে হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষার্থীরা রাজনীতি বোঝে না। তারা বাঁচার দাবি নিয়ে রাজপথে নেমেছে। তারা গণপরিবহন ব্যবস্থার গলদ কোথায় তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে। কিন্তু এই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে কোনো কোনো পক্ষ নিজেদের হীনস্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা করছে- তা দুঃখজনক। বিশেষ করে যারা গুজব ছড়িয়ে সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি এবং যারা অঘোষিত পরিবহন ধর্মঘট ডেকে জনদুর্ভোগের সৃষ্টি করেছে তাদের চিহ্নিত করে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময় যখন রাস্তায় আগুন সন্ত্রাস চলছিল তখনও নিরাপত্তার অজুহাতে বাস মালিকরা ধর্মঘট ডাকেনি। এখন তো শিক্ষার্থীরা সে ধরনের কোনো ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ করেনি। তাহলে পরিবহন মালিকরা কী কারণে নিরাপত্তার অজুহাত দিচ্ছেন? হীনস্বার্থের জন্যই তারা ধর্মঘট ডেকেছেন- তা স্পষ্ট। এর বিরুদ্ধে সরকারের কারও কোনো বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ প্রত্যাশিত।

ড. শামসুল হক বলেন, শিক্ষার্থীদের এখন ক্লাসে ফিরে যাওয়া দরকার- তা নিয়ে দ্বিমত নেই। কিন্তু সরকারের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে অনেক কিছুই বলার আছে। শিক্ষার্থীরা যে ৯ দফা দাবি দিয়েছে, সেটাই শেষ নয়। শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এখানে বিআরটিএ কাজ করে না, পুলিশ তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পরিচালনা করে না, মালিক ও পরিবহনের গডফাদাররা বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। ডিএমপি কমিশনার বলেছেন, চোখ খুলে দিয়েছে। তিনি যদি সেটা সত্যিই অর্থপূর্ণভাবে বলে থাকেন, তাহলে তা কাজের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে হবে। শুধু একটা ঝটিকা ট্রাফিক সপ্তাহ করলেই এর সমাধান হবে না। সড়কে অরাজকতার জন্য দায়ী প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে সড়কে মৃত্যুর পরিসংখ্যানে আমি, আপনি এমনকি মন্ত্রীরাও একটা সংখ্যা হয়ে যোগ হতে পারেন। অরাজকতা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে এর বিরুদ্ধে আবার আন্দোলন হলে তখন কেউই আর সরকারকে বিশ্বাস করবে না।

আন্দোলন ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানসহ ‘মাফিয়াদের’ পদত্যাগের দাবি জানিয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, অনতিবিলম্বে ছাত্রদের ৯ দফা দাবি মেনে নিতে হবে। কারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। ৯ দফা এক দফায় পরিণত হচ্ছে। তাই ছাত্রদের ওপর হামলা না করে সরকারকে তাদের দাবির প্রতি সম্মান দেখাতে হবে।

ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, আমি শুক্রবার বলেছিলাম, শিক্ষার্থীদের রোববার পর্যন্ত দেখে শর্তসাপেক্ষে শ্রেণিকক্ষে ফেরা উচিত। কিন্তু বিভিন্ন মিডিয়ায় তার বক্তব্য খণ্ডিতভাবে প্রচার করা হয়েছে। তিনি বলেন, শুক্র-শনিবার সরকারি অফিস বন্ধ থাকে। এ কারণে রোববার অফিস খুললে সরকার সড়ক নিরাপত্তার জন্য কী পদক্ষেপ নেবে তা সুস্পষ্ট করবে এবং তা দেখে পদক্ষেপ বাস্তবায়নের শর্ত দিয়ে শিক্ষার্থীরা ঘরে ফিরে যাবে- এটাই আমি বলেছিলেন। আমার বক্তব্যের পর সরকার ট্রাফিক সপ্তাহ শুরু করেছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও রাস্তায় নেমেছেন- এগুলো ভালো দিক। কিন্তু শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে মালিকদের ধর্মঘট প্রমাণ করে তারা শিক্ষার্থীদের ৯ দফারও বিরুদ্ধে এবং সড়কে অরাজকতা বন্ধ হোক তা চায় না। এ নিয়ে তো সড়ক ও সেতুমন্ত্রী কিংবা কারও কোনো বক্তব্য নেই। এ কারণে নতুন করে সন্দেহের সৃষ্টি হচ্ছে।

রাজধানীর লালমাটিয়া মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম বলেন, পরিবহন খাতের নৈরাজ্য আগে বন্ধ করতে হবে। সংকট কাটাতে হলে শিক্ষার্থীদের মনে আস্থা সৃষ্টি করতে হবে যে, নিরাপদ সড়কের দাবিতে তারা যে আন্দোলন করছে তার মূল উদ্দেশ্য যথাযথভাবে পূরণ হচ্ছে। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. শাহান আরা বেগম বলেন, টানা তিন দিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেও শিক্ষার্থীদের রাজপথে নামা ঠেকাতে পারিনি। অভিভাবকরা সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে মাঠে নামলে প্রতিষ্ঠানের কী করার আছে!

মিরপুর সিদ্ধান্ত হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম রনি বলেন, সড়ক-মহাসড়কে ট্রাফিক শৃঙ্খলা বলতে গেলে নেই। আইন-কানুনের বালাই নেই। কেউই আইন মানতে চায় না। এতে তো জীবনের ঝুঁকি বাড়বেই। তাই শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি পূরণের পাশাপাশি কঠোরভাবে ট্রাফিক আইন কার্যকর করতে হবে। স্কুল বাস চালু করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে জোরে গাড়ি চালনা রোধ করতে স্পিড ব্রেকার দিতে হবে। সমকাল।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

four × three =