Templates by BIGtheme NET
Home / slider / ‘মধ্যবিত্ত তুই অপরাধী রে…’

‘মধ্যবিত্ত তুই অপরাধী রে…’

Loading...

তুষার আবদুল্লাহ : মধ্যবিত্ত পৃথিবী নামের এই গ্রহের শত্রু হয়ে উঠেছে। গ্রহের যারা মোড়লের দাবিদার, তারা মেনে নিতে পারছে না বিত্তের মধ্য অবস্থানে থাকা জনগোষ্ঠীকে। বিত্তের রাজারা চান, বিত্তহীন আর তাদের মাঝে কোনও শ্রেণি থাকবে না। তারা শোষণ করবে বিত্তহীনদের। সেই শোষণ নিয়ে কোনও প্রশ্ন উঠতে পারবে না। শোষিতরা কোনও প্রতিবাদ ছাড়াই সেই পীড়ন সয়ে যাবে।
মাঝের শ্রেণিটি চঞ্চল। উচ্চবিত্তে ওঠার উচাটন মন তার। কোনোভাবেই স্থির বা স্থিতাবস্থায় তুষ্ট নয় মধ্যবিত্ত। তার এই উড়ু উড়ু মনে লোভ জাগায় বিত্তের সামন্ত প্রভুরা। ভোগের লিপ্সা বাড়ে মধ্যবিত্তের। তৈরি হয় আসক্তি। ছুঁড়ে দেওয়া হয় ভোগের প্রতিযোগিতায়। এই প্রতিযোগিতা নিজ শ্রেণির মধ্যে। ভোগের লড়াইয়ে লেলিয়ে দেওয়ার পেছনের দুরভিসন্ধি হলো– যেন পতন হয় মধ্যবিত্তের। উচ্চে ওঠার মই থেকে যেন সে ছিটকে পড়ে। তাহলেই তাকে শোষণ ও শাসন করা সহজ হবে উচ্চের। মধ্যবিত্ত নিয়ে উচ্চবিত্তের চিন্তিত হওয়ার কারণ— এই শ্রেণিই তাকে প্রশ্ন করতে ও চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারে। বিত্ত যে এই গ্রহের সামাজিক, প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিক দূষণ করছে, মধ্যবিত্তের পর্যবেক্ষণেই তা ধরা পড়ে।

অর্থনৈতিক ভূগোলে কাছাকাছি অবস্থান করায়, মধ্যবিত্ত প্রতিবেশী বিত্তকে চাপের মুখেই রেখে আসছে বরাবর। বিত্তহীন দিবারাত্রিতে স্বপ্ন দেখলেও মধ্যকে ডিঙিয়ে বিত্তের সীমারেখায় ঢোকার যৌক্তিক উপায় খুঁজে পায় না। টিকে থাকার লড়াইয়েই বুঁদ হয়ে থাকে। তবে মধ্যের প্রতি ক্ষোভ আছে তাদেরও। তারা মনে করে মধ্য বুঝি তার ভাগ কেড়ে নিয়েছে। মধ্য আরেকটু সদয় হলেই বিত্তহীন জীবনে দখিনা বাতাস বয়ে যেতো। তাই মধ্য হলো দু’কূলহারা।

অর্থমন্ত্রী ভোটের আগে যে বাজেট দিলেন, সেখানেও দেখছি মধ্যবিত্ত কূলহারা। বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে, এমন বার্তা মেলেনি প্রস্তাবিত বাজেট থেকে। ফলে শিক্ষিত ও অদক্ষ দু’জন সম্পদের কাজের সুযোগ তৈরি হবে না। আমাদের মধ্যবিত্ত নারীরা উদ্যোক্তা হিসেবে সাফল্য দেখালেও তাদের জন্য বাজেটে প্রণোদনা নেই। তথ্যপ্রযুক্তি বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের তরুণরা অনলাইনভিত্তিক ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছিল, সেখানে তাদের উৎসাহ না দিয়ে এই ব্যবসার ওপর কর আরোপ করা হয়েছে।

গণপরিবহনের অব্যবস্থাপনায় মধ্যবিত্ত স্বস্তি পাচ্ছিল উবার-পাঠাও সার্ভিসে। কর বসছে সেখানেও। মধ্যবিত্ত ব্যবহৃত গাড়ি কিনবে, সেখানেও শুল্কের কোপ। রেহাই নেই ছোট ফ্ল্যাট কিনে নিশ্চিত মাথা গোঁজার ঠাঁই খোঁজার। চাকরিজীবীদের বাধ্যতামূলকভাবে কর দিতে হবে। কমেনি ব্যাংক সুদের হার। উল্টো ব্যাংকের টাকা লোপাট করছে যারা তাদের অর্থাৎ বিত্তবানকেই কর ছাড় দেওয়া হলো।

করজাল যেভাবে ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে, তাতে আটকে ফেলা গেছে মধ্যবিত্তকে। বিত্তবান বোয়ালেরা সেই জালে আটকা পড়েননি। অথচ ভোটের মৌসুমে মধ্যবিত্তকে করজাল থেকে রেহাই দেওয়ার কথা। একসময় রাষ্ট্র বা ক্ষমতাবানরা এই কাজই করতো। এখন মধ্যবিত্ত সেই বিবেচনায় না থাকায় মনে হচ্ছে ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারা সুনিপুণভাবে বিত্তবানরা করে নিতে পারছে। এখানে মধ্যবিত্তের ছড়ি ঘোরানোর দিন শেষ। উল্টো মধ্যবিত্ত বিত্তের জয়গান গেয়েই তুষ্ট থাকছে। তার অতীতের প্রতিবাদী অবয়বও খসে পড়েছে। সে এখন যা পাওয়া যায় তাই চেটেপুটে খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে।

মধ্যবিত্তকে এখন হিসাবের খাতায় না রাখলেও চলে। মধ্যবিত্তকে তার আপোসহীন রূপের কারণেই বঞ্চিত হতে হচ্ছে। নয়া বাজেটেও তাই তাদের বরাত শূন্যই রইলো। মধ্যবিত্তের পোড়া কপাল দেখে তাই বলতে হচ্ছে– ‘নিজের দোষে তুই নিজেই অপরাধী রে…’।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

(বাংলা ট্রিবিউন থেকে নেওয়া)

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

20 − ten =