Templates by BIGtheme NET
Home / slider / ‘অস্ত্রের লাইসেন্স আত্মরক্ষার জন্য, খুন করতে নয়’

‘অস্ত্রের লাইসেন্স আত্মরক্ষার জন্য, খুন করতে নয়’

Loading...

অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয় আত্মরক্ষার জন্য। কাউকে খুন করার জন্য নয়। র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ বৈধ-অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে কথা বলেছেন। কথা বলেছেন সুন্দরবনের জলদস্যু দমন ও তাদের পুনর্বাসন নিয়ে। র‌্যাব সদর দফতরে বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে খোলামেলাভাবেই কথা বলেছেন অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারকারী, ব্যবহার ও এর গতিপ্রকৃতি নিয়ে।

বেনজীর আহমেদ ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর থেকে এলিট ফোর্স র‌্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারসহ দেশে-বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। কাজ করেছেন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা ও কার্যপদ্ধতি সংস্কারে গঠিত বিশেষায়িত প্যানেলে। পুলিশের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সাখাওয়াত কাওসার

বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার হচ্ছে। প্রায়ই এ ধরনের অভিযোগ আসে। আপনিও নিশ্চয়ই এ বিষয়ে অবগত, আপনার কাছেও হয়তো অনেক তথ্য আছে। অবৈধ ব্যবহার ঠেকাতে আপনার পরামর্শ কী?

বেনজীর আহমেদ : বৈধ অস্ত্র দিয়ে কেউ যদি গুলি করে, তাহলে তাকে তদন্তের মুখোমুখি হতে হয়। কেউ যদি পাখি মারার জন্যও গুলি করেন, তাহলে এ ব্যাপারে সার্টিফিকেট নিয়ে তাকে জিডি করতে হবে। পুলিশবাহিনীতে বৈধ অস্ত্র মনিটরিং করার পদ্ধতি আছে সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই। থানার অফিসাররা তার এলাকার মধ্যে যতগুলো বৈধ অস্ত্র আছে সেগুলোর বিষয়ে পুরোপুরি আপডেট থাকার কথা। কয়টি গুলি ব্যবহূত হয়েছে এবং তা অবশ্যই কোন জায়গায়, কী কারণে ব্যবহূত হয়েছে সে বিষয়টিও। তবে খাদ্য, চিকিৎসা, বস্ত্র, বাসস্থানের মতো নিরাপত্তাও মানুষের একটা মৌলিক চাহিদা। আমাদের দেশের মানুষ নিরাপত্তার প্রশ্নে এখনো সর্বাংশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর অনেক নির্ভরশীল। যদিও অর্থনৈতিক এবং চিন্তার জায়গায় পরিবর্তনের কারণে এখন নিরাপত্তার চাহিদার ক্ষেত্রেও মানুষের মাঝে অনেক পরিবর্তন এসেছে। ‘কনভেনশনাল থিংকিং অব সিকিউরিটি’ বা ‘টিপিক্যাল থিংকিং অব সিকিউরিটি’ এখন অনেক চেঞ্জ হয়েছে। মানুষ এখন অনেক ইনক্লুসিভ সিকিউরিটির কথা চিন্তা করে।

চলতি বছর কিংবা আগামী বছরের শুরুতেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে নিজেদের প্রভাব বিস্তার নিশ্চিত করতে বিভিন্ন গ্রুপ অবৈধ অস্ত্রের কেনাবেচা ও ব্যবহারে তৎপর হয়। এমনটাই অতীতে হয়ে আসছে। এ বিষয়টি কীভাবে মোকাবিলা করবেন?

বেনজীর আহমেদ : ইলেকশনের আগে কিংবা ইলেকশনের পরে কোনো কথা নয়, মূল কথা হলো আমাদের দেশটাকে অবশ্যই অবৈধ অস্ত্রমুক্ত রাখতে হবে। সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে র‌্যাব ফোর্সেস প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই কাজ করে যাচ্ছে। এ বছরই আমরা এ পর্যন্ত ১ হাজার অস্ত্র উদ্ধার করেছি। আমাদের যে সাতটি সুনির্দিষ্ট ম্যান্ডেট আছে তার মধ্যে অবৈধ অস্ত্র একটি অন্যতম ম্যান্ডেট। এজন্য অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রাধিকার থাকে। ১ জানুয়ারি, ২০১৭ থেকে চলতি এপ্রিল পর্যন্ত আমরা ১ হাজার ৩৫০টি অস্ত্র, ১৮ হাজার ৮৮১ রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার এবং এসব ঘটনায় ৯১৪ জনকে গ্রেফতার করেছি। এর মধ্যে কেবল অস্ত্র ব্যবহারকারী কিংবা বিক্রেতা নয়, যারা বিদেশ থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে অস্ত্র আমদানি করেন তাদেরও আমরা আইনের আওতায় নিয়ে এসেছি। বিশেষ করে আগামী নির্বাচন সামনে রেখে আমরা আরও বেশি বেশি সচেতন থাকব। আমরা চাইব না যে নির্বাচনে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার হোক বা বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার হোক। দুটোই আমরা নিশ্চিত করে নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করতে চাই।

বৈধ অস্ত্রের কোনো পরিসংখ্যান আছে কি?

বেনজীর আহমেদ : আসলে এই পরিসংখ্যানটা এ মুহূর্তে সেন্ট্রালি নেই কোথাও। বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্স দেন জেলা প্রশাসক। আমার জানা মতে, তার অফিসই রেকর্ড সংরক্ষণ করে। বাংলাদেশে থানায় থানায় অস্ত্র রেজিস্টার আছে। তারা মাঝে মাঝে ডিসি অফিসে গিয়ে তা মিলিয়ে নিয়ে আসে। আর ডিসি অফিসে যদি তা আপডেট না থাকে সেখানে থানারও কিছু করার থাকে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল অস্ত্রের ব্যাপারে একটা সেন্ট্রাল ডাটাবেজ করার। তবে এ মুহূর্তে তার কী অবস্থা তা আমি বলতে পারছি না।

দেশে অবৈধ অস্ত্র ঢোকার রুট সম্পর্কে আপনারা অবহিত, তার পরও কেন অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশ বন্ধ করা যাচ্ছে না, এ ক্ষেত্রে আপনাদের দুর্বলতার বিষয়টি স্বীকার করবেন কি?

বেনজীর আহমেদ : আমাদের বিশাল সীমান্ত। সে অনুসারে যে-সংখ্যক বিজিবি বিওপি থাকার কথা, তা নেই। সীমান্ত বরাবর অনেক জায়গা আছে অত্যন্ত দুর্গম। সীমান্ত বরাবর রাস্তা না থাকার কারণে অনেক ক্ষেত্রে টহল দেওয়াও সম্ভব হয় না। পাশের দেশ কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে, আমাদের নেই। সীমান্তে আন্তর্জাতিক মানের গার্ডিং করা সম্ভব না হলে এই ঝুঁকি থেকেই যাবে। এখন সরকার চেষ্টা করছে সীমান্ত-ঘেঁষে রাস্তা নির্মাণের, বিওপির সংখ্যা বাড়ানোর। তখন হয়তো এগুলো সুরক্ষিত হবে। তবে একটা বিষয়— কোনো দেশের বর্ডারই কিন্তু সম্পূর্ণ সুরক্ষিত নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো বর্ডারকে সবচেয়ে দুর্ভেদ্য বলা হয়। এর পরও ওই বর্ডার দিয়ে ড্রাগ আসছে। সম্পূর্ণ যুদ্ধাবস্থা থাকার পরও কাশ্মীরকেন্দ্রিক পাকিস্তান-ভারতের সীমান্তেও মানুষ পাচার হয় এবং মাঝে মাঝেই বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। এর পরও আমাদের যতটুকু যা আছে তাই দিয়েই আমরা আমাদের বর্ডার সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছি। দক্ষতা ও ডেডিকেশন দিয়ে আমরা ওইসব ঘাটতি দূর করতে চাই। আমরা সংখ্যাগত মানে বিশ্বাস করি না, বিশ্বাস করি গুণগত মানে।

অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশ কি কিছুটা কমেছে? সীমান্ত এলাকার অনেক মানুষই অপরাধপ্রবণ, মূলত অপরাধীরা তাদের ব্যবহার করেই অবৈধ অস্ত্র আমদানি, চোরাচালানসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে রাখে। এ ব্যাপারে কিছু বলবেন?

বেনজীর আহমেদ : দেখুন, অস্ত্র কোনো সুনির্দিষ্ট পথ দিয়ে আসে, তা কিন্তু নয়। আমরা জানি চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও যশোর সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র ঢোকে। তবে তা একটি নির্দিষ্ট রাস্তা দিয়ে নয়। আমরা জানি, কারা অস্ত্রের ব্যবসা করে, বিদেশ থেকে অস্ত্র নিয়ে আসে। তাদের কিন্তু আমরা বিভিন্ন সময় অস্ত্রসহ গ্রেফতার করেছি। তবে তারা আদালত থেকে জামিন নিয়ে বের হয়েছে। তাদের কেউ কেউ পুনরায় আগের পেশায় ফিরে গেছে। এসব আমরা নিয়মিত মনিটরিং করেই মূলত এ কাজটি করি। আর সীমান্তের অনেক এলাকায় দেখা যাবে একটি গ্রামের ওপর দিয়ে সীমান্তরেখা। একই পরিবারের কেউ ভারতে আবার কেউ বাংলাদেশে বাস করছে। পেটের দায়ে অনেক মানুষই মাদক, চোরাচালানের মতো ঘৃণিত কাজে জড়াচ্ছে। তবে দেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে আগামী পাঁচ-সাত বছরের মধ্যে এ অবস্থা আর থাকবে না বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

গত বছরের শুরুতে ফেনী সদরে পুলিশ কয়েকটি ইউনিটে বিভক্ত হয়ে জঙ্গি ও মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছিল। ওই বিষয়টি জঙ্গিবিরোধী অভিযানে অনেক আলোচিত হয়েছিল। মাদক কিংবা জঙ্গি প্রতিরোধে সারা দেশে এমন কোনো অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে কি আপনার?

বেনজীর আহমেদ : এটা নির্ভর করে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ওপর। নির্দিষ্ট এলাকায় এ রকম কোনো তথ্য থাকলে আমরা হয়তো আবার পরিকল্পনা করব। তবে সুনির্দিষ্ট ও পর্যাপ্ত তথ্য ছাড়া সারা বাংলাদেশে একই সময়ে অভিযান করা হলে মানুষ বিব্রত হবে, সাধারণ মানুষ বিরক্ত হবে। আমি এর পক্ষপাতী নই। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনাও ঘটার আশঙ্কা থাকে।

দেশে অবৈধ অস্ত্রের সংখ্যা নিয়ে অনেক এনজিও বিভিন্ন তথ্য দেয়? উদ্ধার ছাড়া কী পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র রয়েছে এমন কোনো পরিসংখ্যান আপনার কাছে আছে কি?

বেনজীর আহমেদ : অবৈধ অস্ত্রের সংখ্যা সব সময়ই অনুমাননির্ভর। সংখ্যা বলতে হলে রিসার্চ ও সার্ভে করতে হবে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ নিয়ে কখনো সার্ভে করে না। কারও কাছে অবৈধ অস্ত্র থাকলে তাকে ধরে নিয়ে আসে। আরেকটি বিষয় হলো, একটি এলাকার লক্ষণ বলে দেয় কী পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র রয়েছে সে এলাকায়। আমি নিজে যখন ২০১০ সালে ডিএমপি কমিশনার হিসেবে যোগদান করি তখন প্রতিদিন সন্ধ্যায় ঢাকা শহরে গুলির ঘটনা ঘটত। তবে ২০১০ থেকে ’১২ সালের মধ্যে দুই বছরে ঢাকা শহরকে আমরা পরিষ্কার করেছি। ’১৩ সালের পর থেকে ঢাকায় অস্ত্রের ব্যবহার নেই বললেই চলে।

খোলাবাজারের কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেই জঙ্গি ও সন্ত্রাসীরা বিস্ফোরক তৈরির কাঁচামাল সংগ্রহ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী? তা প্রতিরোধকল্পে কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন আপনারা?

বেনজীর আহমেদ : অনেক কেমিক্যাল গৃহস্থালি, ল্যাবরেটরি ও ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে ব্যবহার হচ্ছে। আবার এই কেমিক্যাল দিয়েই বিস্ফোরক তৈরি করছে অপরাধীরা। আর এর ফরমুলা দেওয়া আছে খোদ ইন্টারনেটে। ‘হাউ টু মেক এ বোম ফ্রম ইউর মম’স কিচেন’ এমন ভিডিও রয়েছে ইন্টারনেটে। তবে এগুলো থেকে ভয় পেলে চলবে না। একটা সময় ছিল দেশ ফরমালিনে ছেয়ে যাচ্ছিল। তখন ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আমরা ঢাকা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে অভিযান চালিয়েছি। হাজার হাজার টন বিষাক্ত ফল আমরা ধ্বংস করেছি। ২০১৪ সালে ফরমালিন আমদানি হতো ৬৯০ টন। এখন হয় ১০০ টনের কম। ফরমালিনের ক্ষেত্রে নতুন আইনে কতটুকু আমদানি করছেন, কার কাছে কতটুকু বিক্রি করছেন এবং ওই ক্রেতা কোন কাজে ব্যবহার করছেন তা রেকর্ড রাখার বিধান রয়েছে। অন্যান্য কেমিক্যালের বিষয়েও আমরা সরকারের সঙ্গে কথা বলছি— কীভাবে বিষয়টি কঠোর মনিটরিংয়ের আওতায় নিয়ে আসা যায়। যেমন এ ক্ষেত্রে কে আমদানি করছেন, কতটুকু আমদানি করছেন, কার কাছে বিক্রি করছেন এবং যিনি কিনছেন তিনি তা কোন কাজে ব্যবহার করছেন সে ব্যাপারে কড়া নজরদারির সুযোগ রয়েছে।

মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার মধ্যে কোন মিল পান আপনি?

বেনজীর আহমেদ : অবশ্যই। সারা বিশ্বে তিনটি ব্যবসা একসঙ্গে যায়। অস্ত্র, মাদক এবং মানব পাচার ও সেক্স ট্রেড। যেখানে মাদক আছে, সেখানে অস্ত্র আছে আর যেখানে অস্ত্র আছে সেখানে মানব পাচার ও সেক্স ট্রেড আছে।

আপনি র‌্যাবের প্রধান হলেও পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। অনেক চাঞ্চল্যকর মামলার অল্প সময়ের মধ্যেই রহস্য উন্মোচন হলেও রাজধানীর উত্তরা ও পূর্বাচলে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য জানতে চাই।

বেনজীর আহমেদ : অনেক সময় তথ্য ও পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে তার তদন্ত ঝুলে যেতে পারে। পশ্চিমা দেশেও এ ধরনের অনেক ঘটনা আছে। যখন কোনো মামলার তদন্ত এগোয় না তখন তারা ওই মামলাগুলোকে ‘ডেড কেস’ ফাইলে নিয়ে যায়। ৩০-৪০ বছরের পুরনো মামলাও সেখানে আছে। তবে কখনো কোনো তথ্য পাওয়া গেলে পুনরায় তা ‘ডেড কেস ফাইল’ থেকে বের করে তদন্ত সম্পন্ন করা হয়। অন্তত ঢাকায় এ ধরনের কোনো মামলা নেই। পাঁচ-ছয় বছরের পুরনো মামলা থাকলেও দেখা যাবে কেউ হাই কোর্টে রিট করে তদন্ত আটকে দিয়েছে। আমি নিজে যখন কমিশনার ছিলাম তখন একটু পুরনো মামলাগুলো কেস বাই কেস আমি দেখেছি এবং তা পাক্ষিকভাবে দেখতাম পেন্ডিং থাকার কারণটা কী? সেজন্যই বলছি, উত্তরা কিংবা আশুলিয়ার অস্ত্রের রহস্য কখনই উদ্ঘাটন হবে না তা বলা ঠিক হবে না।

অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কিংবা অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদের লাইসেন্সকৃত অস্ত্র ভাড়ায় ব্যবহূত হয় এমন অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বিডিআর বিদ্রোহের সময় খোয়া যাওয়া অস্ত্রের ব্যাপারে কোনো তথ্য আছে কিনা?

বেনজীর আহমেদ : বিভিন্ন বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের অস্ত্র ভাড়ায় ব্যবহূত হয় এমন তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে আমরাই কিন্তু রংপুরে ডিসি অফিস থেকে ফেইক লাইসেন্স দেওয়ার মূল হোতাকে গ্রেফতার করেছিলাম। বিডিআরের অস্ত্র কিছু মিসিং আছে এটা সত্য। তবে ওই মিসিং অস্ত্রগুলো কোথাও ব্যবহূত হচ্ছে এ ধরনের কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য এখন পর্যন্ত আমার কাছে নেই।

সুন্দরবনের জলদস্যু দমনে র‌্যাবের অনেক সাফল্য রয়েছে। তবে উদ্ধারকৃত অস্ত্রগুলো কী করছেন আপনারা? আবার আত্মসমর্পণকৃত জলদস্যুদের অবস্থাই বা কী?

বেনজীর আহমেদ : সুন্দরবনের জলদস্যু দমনকে র‌্যাব চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। এ পর্যন্ত আমদের কাছে ২০ বাহিনীর ২১৭ জন জলদস্যু বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ করেছে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত অস্ত্র, গোলাবারুদ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তাদের পুনর্বাসনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে প্রত্যেককে ১ লাখ, এক্সিম ব্যাংকের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার ও র‌্যাবের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রত্যেককে মোবাইল ফোন কিনে দিয়েছি। তাদের বর্তমান অবস্থা আমরা মনিটরিং করছি। ঈদ, পূজা-পার্বণে আমরা গিফট পাঠাচ্ছি। দেখা গেছে জলদস্যু হওয়ার আগে তারা যে পেশায় ছিল অনেকে সেই পেশায় ফিরে গেছে। আমাদের জানা মতে, এখনো চারটি ছোট ছোট জলদস্যু গ্রুপ সুন্দরবনে কাজ করছে। দুটি বাহিনীর প্রধান থাকে ভারতে। মাঝে মাঝে সাতক্ষীরা অঞ্চলে এসে পুনরায় ভারতে চলে যায়। আমার বিশ্বাস, খুব শিগগিরই এই বাহিনীর সদস্যরাও আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করবে। এরই মধ্যে তারা বিভিন্ন মাধ্যমে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। আত্মসমর্পণকৃত জলদস্যুদের আমরা মামলা দিয়ে আইনের মাধ্যমে আদালতে সোপর্দ করছি। আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে যারা বেরিয়ে আসে তাদের আমরা সমাজে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করছি; যাতে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারে।

আত্মসমর্পণকারীদের মানসিকতা কিছুদিন পর পুনরায় বদলে যেতে পারে কি?

বেনজীর আহমেদ : যারা জলদস্যু ছিল তারা কিন্তু সবসময় ফেরার জীবনযাপন করত। প্রতি পদে ছিল মৃত্যুর ঝুঁকি। স্ত্রী-পুত্র-পরিজনদের কাছ থেকে মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর দূরে থাকতে হতো। হরিণের মাংস, বড় মাছ ও গলদা চিংড়ি দিয়ে ভাত খেলেও তারা ছিল ফেরারি। পরিবারের সঙ্গে দেখা করার জন্য যেতে হতো বহুদূরের কোনো জেলায় তৃতীয় কোনো জায়গায়। আত্মসমর্পণ করেছে এমন এক সাবেক জলদস্যু আমার সঙ্গে কথা বলার সময় অঝরে তার চোখ দিয়ে পানি ঝরেছে। সে বলেছে, ‘স্যার, আমি ভাবতাম মারা যাওয়ার পর আমার লাশ সাগরের মাছে খাবে। আমার স্বাভাবিক মৃত্যু হবে না, স্বাভাবিক দাফনও হবে না।’ এ রকম ধারণা ছিল অনেকেরই। সুন্দরবন এলাকার মানুষ কেন জলদস্যু হচ্ছে? পেশাদার রিসার্চ ফার্মকে দিয়ে আমরা এই গবেষণাটা করাচ্ছি। খুব শিগগিরই আমরা এটা প্রকাশ করব। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

twelve + fourteen =